“মাইনে দেওয়ার টাকা নেই”-সরকারি কর্মীদের হরতাল, বাংলাদেশে এবার ‘গৃহযুদ্ধ’ পরিস্থিতি?

মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের নীতিগুলি নিয়ে বাংলাদেশে তীব্র অসন্তোষ ও অস্থিরতা ক্রমশ বাড়ছে। নাগরিক সমাজ এবং বাণিজ্য মহলের পক্ষ থেকে সরকারের বিরুদ্ধে লাগাতার বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু হয়েছে। রাজধানী ঢাকা শহরে অশান্তির আঁচ ক্রমশ প্রকট হচ্ছে এবং প্রশাসন চূড়ান্ত অরাজকতার আশঙ্কা করছে।
দেশের বাণিজ্যিক সংগঠনগুলির শীর্ষস্থানীয় নেতারা সরকারের অর্থনৈতিক নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন। প্রসিদ্ধ বাণিজ্যিক সংগঠনের নেতা শওকত আজিজ রাসেল উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, “১৯৭১ সালে যেভাবে বুদ্ধিজীবীদের খুন করা হয়েছিল, এবার তেমন ভাবেই ব্যবসায়ীদের ভাতে মারা হচ্ছে। অধিকাংশ লোক রোজগারহীন।” বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিল অ্যাসোসিয়েশনের অধ্যক্ষ রাসেল, ব্যবসায়িক সমিতির একটি যৌথ সাংবাদিক সম্মেলনে শঙ্কার সঙ্গে জানান, “আমরা জানি না ইদ-উল-আজহার আগে শ্রমিকদের বোনাস এবং বেতন দিতে পারব কি না।” দেশের অর্থনীতির এই অচলাবস্থা শ্রমিক এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করেছে।
এর পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারীরা প্রস্তাবিত সরকারি সেবা (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ আইনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ সচিবালয়ের সামনে লাগাতার দু’দিন ধরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছেন। এই আইন প্রবর্তন হলে যে কোনও মুহূর্তে সরকারি কর্মচারীদের কঠোর শাস্তি এবং কাজ থেকে বরখাস্ত করা প্রশাসনের কাছে অতি সহজ হয়ে যাবে বলে তাঁরা মনে করছেন। সরকারি কর্মচারীরা অবিলম্বে এই প্রস্তাবিত আইন ফিরিয়ে নেওয়ার দাবি জানাচ্ছেন।
চুক্তিভিত্তিক কর্মীরাও গত দু’দিন ধরে কাজ বন্ধ রেখেছেন, যা সরকারি পরিষেবাগুলিতে প্রভাব ফেলছে। অন্যদিকে, রাষ্ট্রীয় রাজস্ব বোর্ডও অন্য একটি আইন তুলে নেওয়ার দাবিতে সোমবার থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কর্মবিরতি ডেকেছে।
জনগণের অসন্তোষের এই ঢেউয়ে যোগ দিয়েছেন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও। তাঁরাও অনির্দিষ্টকালের জন্য পঠনপাঠন বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। শিক্ষকদের তিনটি মূল দাবি রয়েছে, যার মধ্যে ১১ গ্রেড অনুযায়ী বেতন না পেলে তাঁরা কাজ করবেন না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন।
এই বহুমুখী চাপে পড়ে ইউনূস সরকার বর্তমানে সাঁড়াশি আক্রমণের মুখে পড়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা বলতে বাধ্য হয়েছেন যে বাংলাদেশে বর্তমানে গৃহযুদ্ধের মতো পরিস্থিতি চলছে। প্রেস সচিব শফিকুল আলম, মুহাম্মদ ইউনূসের বক্তব্য তুলে ধরে বলেছেন, “দেশের ভিতরে এবং বাইরে যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। আমরা এগোতে পারছি না। সব নষ্ট হয়ে গিয়েছে এবং ফের গোলামি করার মতো পরিস্থিতির দিকে দেশকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “যখন থেকে আওয়ামি লিগের গতিবিধির উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে, তখন থেকে দেশকে অস্থির করে তোলার প্রয়াস শুরু হয়েছে। এই অধঃপতন থেকে বাঁচতে হবে আমাদের।”
এই চরম অস্থিতিশীলতার মধ্যে, মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের জন্য আরও ৬ মাসের সময়সীমা চেয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, চলতি বছর ডিসেম্বর থেকে আগামী বছর জুন মাসের মধ্যে নির্বাচন করানো হবে। যদিও প্রথমে তিনি ২৫ ডিসেম্বরের মধ্যেই নির্বাচন করানোর কথা বলেছিলেন। আগামী বছর ৩০ জুনের পর তিনি নিজের পদে আর থাকবেন না বলেও সাফ জানিয়ে দেন ইউনূস এবং প্রতিশ্রুতি দেন যে তার আগেই বাংলাদেশে নির্বাচন সম্পন্ন হবে। তবে দেশের বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনা করে এই প্রতিশ্রুতির বাস্তবায়ন নিয়ে জনমনে সংশয় দেখা দিয়েছে।