“জোর করে বাড়িতে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে স্মার্ট মিটার”-বিদ্যুৎ বিল কি বাড়বে? জেনেনিন বিস্তারিত

রাজ্যজুড়ে স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ শুরু হতেই গ্রাহকদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন জেলা থেকে বিদ্যুৎ দফতরে জমা পড়ছে ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও লিখিত অভিযোগের স্তূপ। গ্রাহকদের অভিযোগ, তাঁদের অনুমতি ছাড়াই বা জোর করে বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে, এবং এরপর থেকেই বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। প্রশ্ন উঠছে, প্রযুক্তির উন্নতির আড়ালে কি আসলে সাধারণ মানুষের উপর খরচের বোঝা চাপানো হচ্ছে?
স্মার্ট মিটার কী এবং কেন এত অভিযোগ?
বিদ্যুৎ দফতরের এক পদস্থ কর্মী জানিয়েছেন, স্মার্ট মিটার হলো এক ধরনের অত্যাধুনিক বৈদ্যুতিক মিটার, যা দূর থেকেই বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সরাসরি বিদ্যুৎ দফতরে পাঠাতে পারে। এর সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো এর ‘প্রিপেইড মোড’। অনেকটা মোবাইল ফোনের মতোই, আগে থেকে টাকা রিচার্জ না করলে বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে যাবে।
গ্রাহকদের মূল অভিযোগগুলো হলো:
অনুমতি ছাড়া স্থাপন: বহু গ্রাহক অভিযোগ করছেন, তাঁদের সম্মতি ছাড়াই বা জোর করে তাঁদের বাড়িতে স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে।
অস্বাভাবিক বিল বৃদ্ধি: সাধারণ মিটারের তুলনায় স্মার্ট মিটার বসানোর পর থেকে বিল অনেক বেশি আসছে বলে দাবি করছেন অনেকে।
নজরদারির আশঙ্কা: স্মার্ট মিটার প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের তথ্য সার্ভারে পাঠায়, যা গ্রাহকদের মধ্যে নজরদারির ভয় তৈরি করছে।
মাঝরাতে সংযোগ বিচ্ছিন্ন: প্রিপেইড রিচার্জ ফুরিয়ে গেলে মাঝরাতেও বিদ্যুৎ সংযোগ কেটে যাচ্ছে, যা সাধারণ মানুষের চরম ভোগান্তির কারণ হচ্ছে।
রিচার্জের সমস্যা: অনলাইন বা অ্যাপে রিচার্জ করতে গিয়ে অনেকেই প্রযুক্তিগত সমস্যায় পড়ছেন।
বিদ্যুৎ দফতরের যুক্তি ও বাস্তবের চিত্র
বিদ্যুৎ দফতর অবশ্য তাদের পদক্ষেপের পক্ষে যুক্তি দিচ্ছে। তাদের দাবি, এর মূল উদ্দেশ্য হলো বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা, বিদ্যুৎ চুরি রোধ করা এবং দ্রুত পরিষেবা দেওয়া। এক ইঞ্জিনিয়র বলেছেন, “কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছেন। সমস্যা হলে দফতরে আসুন, আমরা সমাধান করব।”
তবে, বাস্তব চিত্র অন্য কথা বলছে। পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে অভিযোগ আসছে যে, মিটার বসানোর ক্ষেত্রে ভয় দেখানো হচ্ছে। এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিটার বিকল হলে তার দায়ও গ্রাহকদের উপর চাপানো হচ্ছে, যার ফলে মিটার বদল বা সারাইয়ের অতিরিক্ত খরচও গ্রাহকদেরই বহন করতে হচ্ছে।
কারা সবচেয়ে বেশি বিপাকে?
স্মার্ট মিটার ব্যবস্থার কারণে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন কয়েকটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী:
গ্রামীণ অঞ্চলের কৃষকরা: রাতের বেলা সেচ দেওয়ার সময় হঠাৎ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় তাঁদের ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
বৃদ্ধ ও অসুস্থ গ্রাহকরা: প্রযুক্তিগত ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে তাঁরা চরম সমস্যায় পড়ছেন।
নিম্নবিত্ত পরিবার: প্রতি মাসে আগাম টাকা জোগাড় করে বিদ্যুৎ কিনতে এবং খরচ চালাতে তাঁদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া ও সরকারের পরিকল্পনা
এই স্মার্ট মিটার বিতর্ক রাজনৈতিক মহলেও ঢেউ তুলেছে। সিপিএম এবং তাদের শ্রমিক সংগঠন ‘সিটু’ অভিযোগ করেছে যে, এই স্মার্ট মিটার বসানোর মাধ্যমে রাজ্য সরকার আসলে বিদ্যুৎ পরিষেবার ‘আংশিক বেসরকারিকরণ’ চালু করছে এবং বিদ্যুৎ পরিষেবা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে সরকারি অফিস, পৌরসভা, পঞ্চায়েত, শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগে স্মার্ট মিটার বসানো হচ্ছে। এরপর পর্যায়ক্রমে সাধারণ গ্রাহকদের মিটার বদলানো হবে। বিদ্যুৎ দফতরের লক্ষ্য, ২০২৫ সালের মধ্যে ৫০ লক্ষ স্মার্ট মিটার বসানো।
স্মার্ট মিটার কি সত্যিই বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বিপ্লব আনবে, নাকি এটি সাধারণ মানুষের পকেট কাটছে—এই বিতর্ক এখন তুঙ্গে। আপনার কি মনে হয়, এই নতুন ব্যবস্থা গ্রাহকদের জন্য সুবিধাজনক হবে?