“ভারতীয় তরুণদের সামরিক ট্রেনিং মাস্ট!”-ইজ়রায়েলের পথে হাঁটার পরিকল্পনা করছে সেনা?

পহেলগামে সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলা, ভারতের ‘অপারেশন সিঁদুর’ এবং ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে চলমান উত্তেজনার আবহে ভারতীয় সেনাবাহিনী দেশের তরুণ প্রজন্মের জন্য বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ শুরুর কথা ভাবছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরবর্তী পর্যায়ে দেশের সামরিক পরিকাঠামো খতিয়ে দেখার পরই সেনাকর্তারা এই পথে হাঁটার কথা বিবেচনা করছেন বলে জানা গেছে। তাঁদের মতে, অদূর ভবিষ্যতে যেকোনো যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হলে দেশের তরুণ প্রজন্মকে প্রস্তুত রাখা অত্যন্ত জরুরি।
কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আলোচনা ও বিলের প্রেক্ষাপট:
এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ স্তরের সঙ্গে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্তাদের একপ্রস্ত আলোচনা হয়েছে। পুরো ভাবনাটি এখন সরকারি অনুমোদনের ওপর নির্ভরশীল বলে নয়াদিল্লির সরকারি সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
এর আগেও ভারতে বাধ্যতামূলক সেনা প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। ২০১৯ সালে বর্তমান বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পাল সংসদে একটি প্রাইভেট মেম্বার বিল এনেছিলেন, কিন্তু সেই বিল নিয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়ায় আলোচনা আর এগোয়নি। ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর প্রেক্ষাপটে নতুন করে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণের ভাবনাটি আবার আলোচনায় এসেছে।
সেনাবাহিনীর প্রস্তাব ও যুক্তি:
সরকারি সূত্রের দাবি, সেনার উচ্চপদস্থ কর্তারা চাইছেন, ১৭-২৩ বছর বয়সী পুরুষ ও মহিলাদের বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হোক। এই নীতি প্রয়োগ করা হলে একটি শক্তিশালী ‘ব্যাক আপ ফোর্স’ তৈরি থাকবে, যা যেকোনো আপৎকালীন পরিস্থিতির মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে পারবে।
সেনাকর্তাদের ভাবনা, এই বয়সসীমার মধ্যে পুরুষ ও মহিলাদের অন্তত এক বছর বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ এবং এক বছর সেনায় ডিউটি বাধ্যতামূলক করা হলে দেশের সামরিক পরিকাঠামো অনেক বেশি মজবুত হবে। সেনাবাহিনীর যুক্তি, আমাদের দেশে সব সময়ে যুদ্ধের অবস্থা দেখা না দিলেও, বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দুর্ঘটনা এবং জঙ্গি হামলায় প্রতি বছর গড়ে আড়াই হাজারের কাছাকাছি সেনা জওয়ান প্রাণ হারান। এই সংখ্যাটা কমবে না, উল্টে আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি, বহু সেনা জওয়ান এবং আধিকারিক নিয়মিত অবসর নিচ্ছেন। এই বিপুল শূন্যস্থান পূরণ করা সহজ নয়, এবং ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’ দিয়েও এই শূন্যস্থান পূরণ করা কঠিন। সেই কারণেই ‘ব্যাক আপ ফোর্স’ হিসেবে ‘কনস্ক্রিপশন আর্মি’ তৈরি রাখার কথা ভাবা হচ্ছে।
অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট জেনারেল উৎপল ভট্টাচার্যের মতে, “এই ভাবনাটা নিঃসন্দেহে যুগোপযোগী। ভারতের মতো দেশে সব সময়েই এফেক্টিভ ব্যাক আপ ফোর্সের প্রয়োজন রয়েছে।”
বিশ্বজুড়ে বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ:
উল্লেখ্য, ‘কনস্ক্রিপশন আর্মি’ বা বাধ্যতামূলক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়ার ধারণা বিশ্বের বহু দেশেই সমাদৃত। শুধু ইজরায়েল নয়, এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে চিন, উজবেকিস্তান, উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া এবং তাইওয়ানে আগে থেকেই এই নীতি প্রযোজ্য।
এর বাইরে অস্ট্রিয়া, ডেনমার্ক, সুইডেন, গ্রিস, রাশিয়া, ব্রাজিল, কাতার, মরক্কো, প্যারাগুয়ে, ইরান, তুরস্ক-সহ বিশ্বের বেশ কয়েকটি দেশেও বহু বছর ধরে চলছে এই নীতি। এই দেশগুলিতে সামরিক প্রশিক্ষণের স্তর আলাদা, অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ ও মহিলাদের প্রশিক্ষণের মধ্যে তারতম্যও আছে। সূত্রের দাবি, ভারতের সেনাকর্তারা চাইছেন, আমাদের দেশে পুরুষ ও মহিলা সবার জন্যই বাধ্যতামূলক করা হোক সামরিক প্রশিক্ষণ।
আমাদের দেশে ‘কনস্ক্রিপশন আর্মি’ না থাকলেও ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’ বা টিএ (TA) আছে। এই টিএ-ই হলো আমাদের সেনার ব্যাক আপ ফোর্স। সমাজের বিভিন্ন পেশায় কর্মরত নাগরিকদের এই ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’তে নিয়োগ করা হয়।
‘অপারেশন সিঁদুর’-এর পরে ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি অ্যাফেয়ার্স (সিসিএস) ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’কে যেকোনো জরুরি প্রয়োজনে ডাকার ক্ষমতা দিয়েছে চিফ অফ ডিফেন্স স্টাফের উপরে। তবে সেনাকর্তারা মনে করছেন, জেট যুগে প্রযুক্তি নির্ভর যুদ্ধের আবহে ‘টেরিটোরিয়াল আর্মি’র পাশাপাশি অদূর ভবিষ্যতে ব্যাক আপ ফোর্সের ভূমিকায় অনেক বেশি কার্যকর হতে পারে তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিরা। এই প্রস্তাব কি শেষ পর্যন্ত সরকারি অনুমোদন পাবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।