লস্করের প্রভাবশালী ‘মৌলানা’ আমির হামজার জীবন সঙ্কটে, ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’-এর শিকার?

বেপরোয়া আত্মবিশ্বাস আর ডাকাবুকো মনোভাবের চরম পরিণতি কি ভেন্টিলেটর? এই প্রশ্নই এখন ঘুরে বেড়াচ্ছে পাকিস্তানের জঙ্গি মহলে, কারণ লস্কর-ই-তৈবার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা মৌলানা আমির হামজা এখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। লস্করের সরাসরি ঘাতক বাহিনীর সদস্য না হয়েও, আমেরিকার ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টের খাতায় ‘আফগান মুজাহিদিন’ হিসেবে যার নাম আলাদা করে উল্লেখ করা হয়েছে, সেই হামজার গুরুতর জখম হওয়ার খবর ধামাচাপা দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা থেকেই স্পষ্ট, লস্কর সংগঠনে তার প্রভাব কতটা গভীর।
‘অপারেশন সিঁদুর’ ও নতুন আতঙ্ক:
পহেলগামের বৈসরনে পর্যটকদের ওপর জঙ্গি হামলার এক মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ, বৃহস্পতিবার। এর পরপরই ভারত পাকিস্তানের মাটিতে জঙ্গি ক্যাম্প লক্ষ্য করে নিখুঁত প্রত্যাঘাত করেছে ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে, যা লস্করের মুরিদকে এবং জইশের বাহাওয়ালপুরের মূল ডেরা ছত্রভঙ্গ করে দিয়েছে। ভাই আব্দুল রউফ আজহার-সহ পরিবারের ডজনখানেক সদস্যকে খুইয়ে আপাতত গা ঢাকা দিয়েছেন মৌলানা মাসুদ আজহার। ভারতের অন্যতম মূল টার্গেট হাফিজ মহম্মদ সইদও রয়েছেন গোপন আস্তানায়। এই দুই ‘সাপের মাথা’কে হাতে পাওয়াই এই মুহূর্তে ভারতের প্রধান লক্ষ্য।
কিন্তু আইএসআই এবং পাক সেনা কেন এই দুই জঙ্গি নেতাকে এত আড়াল করে রাখছে? শুধুই কি ভারতের নাগাল থেকে বাঁচাতে? শুধুই কি পাক জঙ্গিদের সঙ্গে তাদের দশকের পর দশক ধরে চলে আসা সম্পর্কের খাতিরে? ভারতীয় গোয়েন্দারা বলছেন, না। কারণ নতুন এক আতঙ্ক পাক জঙ্গিদের, বিশেষ করে লস্করকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। ইজরায়েলি গুপ্তচর সংস্থা ‘মোসাদ’-এর কায়দায় সম্প্রতি একের পর এক লস্কর নেতার ওপর চলছে ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’। হঠাৎ বাইকে করে এসে আততায়ীরা সকলের সামনে টার্গেটকে গুলি করে মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
২০২২ সাল থেকে এই ধারা শুরু হলেও, গত এক বছরে এমন হামলা তীব্রভাবে আঘাত করেছে লস্করকে। একে একে খতম হয়েছে হাফিজের ভরসার ঘনিষ্ঠ কম্যান্ডাররা। গত রবিবারই লস্কর প্রধানের অত্যন্ত কাছের কম্যান্ডার রাজাউল্লাহ নিজামানি ওরফে আবু সইফুল্লা খালিদকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়েছে।
হামলার ধরণ দেখে অনেকেরই ধারণা, একটি নির্দিষ্ট বৃত্ত তৈরি করে চারদিক থেকে ক্রমশ ঘিরে ধরা হচ্ছে পহেলগাম হামলার প্রধান চক্রীকে। ভারতীয় গোয়েন্দারা বলছেন, এই ‘টার্গেটেড কিলিং’-এর ভয়েই হাফিজ এবং মাসুদকে গা ঢাকা দিয়ে রেখেছে পাকিস্তান।
আমির হামজার আঘাত ও গোপন তৎপরতা:
পহেলগাম হামলার পরেই হাফিজের সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ড করে দেওয়া হয় লস্করের একদল শীর্ষ কম্যান্ডারকে। গোয়েন্দারা বলছেন, এই তালিকায় সর্বাগ্রে নাম ছিল ৬৬ বছর বয়সী আমির হামজার। কারণ এই তাত্ত্বিক নেতাকে কোনোভাবেই ঝুঁকির মুখে ফেলতে চায়নি হাফিজ।
গোয়েন্দা সূত্রের খবর, হামজা পরিষ্কার জানিয়েছিল, যেহেতু সে কম্যান্ডার নয় এবং ঘাতকদের কাজের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়, তাই সে বাকিদের তুলনায় অনেকটাই ‘নিরাপদ’। শুধু তাই নয়, গোয়েন্দাদের আরও দাবি, নিজের প্রভাব নিয়ে হামজা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে, তার কোনো নিরাপত্তার প্রয়োজন রয়েছে বলেই মনে করত না।
এহেন হামজাকেই এখন লড়তে হচ্ছে মৃত্যুর সঙ্গে। লক্ষণীয়ভাবে মঙ্গলবার বিকেলের দিকে হামজা জখম হলেও, সেই খবর বেশি রাত পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি। শেষ পর্যন্ত সে খবর চেপে রাখা যায়নি, ঠিক যে ভাবে আটকে রাখা যায়নি আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য — হামজাকে ভর্তি করা হয়েছে লাহোর মিলিটারি হাসপাতালে।
জানা গেছে, নিজের বাড়িতেই জখম হয়েছেন হামজা। তবে কীসের জখম, কী ভাবে জখম — সে সম্পর্কে কারও তরফে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছুই জানানো হয়নি। কিন্তু ভারতীয় গোয়েন্দারা বলছেন, হামজা ভর্তি হওয়ার পরেই লাহোর কম্যান্ড হাসপাতাল ছেয়ে গিয়েছে আইএসআই-এর অফিসার এবং এজেন্টে।
কেন এত তৎপরতা? কোনো খবর ধামাচাপা দিতে? তাহলে কি হামজাও ‘টার্গেটেড অ্যাটাক’-এর শিকার? হাসপাতালের বেডে রক্তাক্ত হামজার একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে বুধবার সকাল থেকে (যার সত্যতা যাচাই করেনি ‘এই সময়’)। তাতে দেখা যায় হামজা প্রায় সংজ্ঞাহীন।
গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, হামজা এই মুহূর্তে ফুল ভেন্টিলেশন সাপোর্টে রয়েছে। অবস্থা অত্যন্ত সঙ্কটজনক। এ নিয়ে পাকিস্তানে কেউ টুঁ শব্দ পর্যন্ত করছে না। শুধু জানা গেছে, বাড়িতে দুর্ঘটনাক্রমে গুরুতর জখম হয়েছেন হামজা। কিন্তু রাজাউল্লাহর হত্যার পর এই ঘটনাকে ওয়াকিবহালদের অধিকাংশই স্রেফ দুর্ঘটনা বলে উড়িয়ে দিতে নারাজ।
তাঁরা যে খুব একটা ভুল নন, তারও প্রমাণ মিলেছে। লস্কর-পন্থী টেলিগ্রাম চ্যানেলগুলিতে আড়ি পেতে গোয়েন্দারা নানা বার্তা ইন্টারসেপ্ট করেছেন, যার মধ্যে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে সবথেকে বেশিবার বলা হয়েছে — “অত্যন্ত সঙ্কটের মুহূর্ত আমাদের কাছে। এই কঠিন সময়ে সকলে শক্ত থাকুন।”
লস্করের তাত্ত্বিক নেতা হিসেবে হামজার গুরুত্ব:
কেন একজন তাত্ত্বিক নেতার এত গুরুত্ব লস্করের কাছে? ১৯৮৫-’৮৬ সালে আফগান-সোভিয়েত যুদ্ধের সময়ে জন্ম হয় ‘আফগান মুজাহিদিন’ নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর। ওসামা বিন লাদেনের অর্থ এবং অস্ত্রে পুষ্ট এই গোষ্ঠীতে হাফিজ মহম্মদ সইদ, আবু তালহা, আব্দুল্লা ইউসুফ আজম, আব্দুল রেহমান মাক্কি, জাকিউর রহমান লাকভি-এর মতো ১৭ জন তাজা মুজাহিদিনের সঙ্গেই ছিল হামজার নাম। ওই সময়েই লস্করের প্রতিষ্ঠা হয় এদের হাত ধরে। কালক্রমে একেক জনের উপরে দেওয়া হয় একেকটি দায়িত্ব।
বাগ্মী এবং জ্ঞানী, সেই সঙ্গে লেখালিখিতে পারদর্শী হামজার উপরে আসে দলের তাত্ত্বিক দিক সামলানোর ভার। পরে সেই সূত্রেই ফান্ডিং-এর একটা অংশের দেখাশোনা শুরু করে সে। কাজের ব্যাপারে সরাসরি শুধুমাত্র হাফিজ আর মাক্কির সঙ্গেই যোগাযোগ রাখত হামজা।
লস্করের বিভিন্ন সভায় তার বক্তৃতা আগুন ঝরায় বলে গোয়েন্দারা জানতে পেরেছেন। তার লেখা ‘কাফিলা, দাওয়াত অউর শাহাদত’, ‘শারাহ-এ-বেহেস্ত’-এর মতো বইয়ের লেখনী চোখে পড়ার মতো বলে পাঠকদের একাংশের বক্তব্য।
২০০০ সালের দিকে কিছুটা সময়ের জন্য লস্করের সশস্ত্র জঙ্গি উইংয়ের একটি দায়িত্ব হামজাকে দেওয়া হয়েছিল। ২০০৫-এ বেঙ্গালুরুতে ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ সায়েন্সে জঙ্গি হামলাই হলো একমাত্র ঘটনা যেখানে হামজার নাম সরাসরি উঠে আসে। ঘটনাচক্রে সেই হামলার মাস্টারমাইন্ডই ছিল রাজাউল্লাহ, যাকে গত রবিবার খুন করা হয়।
লস্করকে জঙ্গি সংগঠন হিসেবে ঘোষণা করার পরে এক সময়ে ফান্ডের অভাবে ধুঁকতে থাকে হাফিজ। সেই সময়ে সরকারিভাবে লস্করের সঙ্গে ‘বিচ্ছেদ’ ঘটিয়ে হামজা খুলে ফেলে নতুন সংগঠন ‘জৈশ-ই-মানকাফা’। এই সংগঠনটির মাধ্যমে চ্যারিটি বাবদ বিপুল টাকা তুলে লস্করের কোমর ফের শক্ত করে তাকে কোমা থেকে টেনে তোলে হামজাই। সেই হামজাই এখন প্রায় কোমায় বলেই গোয়েন্দা সূত্রের খবর।