“যারা যোগ্য তাঁদেরই পুরস্কৃত করা হয়েছে”-TMC-র সাংগঠনিক রদবদল নিয়ে যা বললেন অভিষেক

আগামী বছর রাজ্যে বিধানসভা ভোটকে সামনে রেখে শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস তাদের সাংগঠনিক কাঠামোয় বড়সড় রদবদল করেছে। গত শুক্রবার (১৬ মে) প্রায় ১৮টি সাংগঠনিক জেলায় এই পরিবর্তন আনা হয়েছে, যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই দলের অন্দরে জল্পনা চলছিল। পুরো বিষয়টাই দলের নেতা-কর্মীদের পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে হয়েছে বলে সোমবার দাবি করলেন তৃণমূল সাংসদ তথা দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়।

সোমবার দিল্লি যাওয়ার আগে দমদম বিমানবন্দরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় রদবদল নিয়ে তার অবস্থান স্পষ্ট করেন। তিনি বলেন, “যাঁরা যোগ্য, যাঁরা পরিশ্রম করেছেন, তাঁদের দল পুরস্কৃত করেছে।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এমনটা হয়েছে যে কেউ প্রচুর পরিশ্রম করেছেন, অথচ সেই জায়গায় দল আশানুরূপ ফল করতে পারেনি, কিন্তু তাদের পরিশ্রমের তো বিকল্প হয় না, তাই দল সেসব ব্যক্তিদের পুরস্কৃত করার যথাসাধ্য চেষ্টা করেছে। কাউকে জেলা স্তর থেকে রাজ্য স্তরে আনা হয়েছে, কাউকে নতুন পদে আনা হয়েছে।

অভিষেক জানান, গত লোকসভা নির্বাচনের ফলাফল এবং সারা বছরের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, এই দুটি বিষয় পর্যালোচনার ভিত্তিতে দল পরিশ্রমীদের পুরস্কৃত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে দেন যে এই পুরো প্রক্রিয়ায় দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুমোদন রয়েছে। তিনি বলেন, “রদবদল দলের সিদ্ধান্ত। আমরা বিভিন্ন স্তরে পর্যালোচনা করে এবং দলের মধ্যে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তগুলি নিয়েছি। ব্লক থেকে জেলা স্তরে সকলের কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া হয়েছে এবং যেখানে যা পরিবর্তন হয়েছে, সবটাই দলনেত্রীর অনুমোদনে হয়েছে।”

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, পারফরম্যান্সই যে রদবদলের অন্যতম মাপকাঠি হবে, সে কথা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় একাধিক বার বলেছেন। এবারের রদবদলে তার প্রতিফলন স্পষ্ট। গত লোকসভা নির্বাচনে তৃণমূল অনেক আসনে জয় ছিনিয়ে এনেছে, যেখানে আগে হার হয়েছিল। আবার কোথাও কোথাও জেতা আসন হেরে গিয়েছে। সাম্প্রতিক রদবদলেও তারই প্রভাব পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। অভিষেকের কথায়, “কে কোথায় থাকবেন না থাকবেন, পারফরম্যান্সের ভিত্তিতে তা ঠিক করা হয়েছে।” যাঁরা সাংসদ নির্বাচিত হয়েছেন, তাঁদের জেলা স্তর থেকে সরিয়ে রাজ্য স্তরে আনা হয়েছে। কেউ সাধারণ সম্পাদক, কেউ সহ-সভাপতি বা সম্পাদকের মতো নতুন পদ পেয়েছেন। অনেককে আবার ব্লক স্তর থেকে জেলা স্তরে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দলে সকলের ভূমিকাই পাল্টেছে বলে তিনি জানান।

এবারের তৃণমূলের সাংগঠনিক রদবদলের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো বীরভূম ও কলকাতা উত্তরের পরিবর্তন। বীরভূমে সংগঠন চালানোর ভার সম্পূর্ণভাবে দেওয়া হয়েছে কোর কমিটিকে। অনুব্রত মণ্ডল-সহ ৭ সদস্যের কোর কমিটিই জেলার সব কর্মসূচি করবে। সেই নির্দেশ মেনে রবিবার কোর কমিটির প্রথম বৈঠকও হয়েছে। কলকাতা উত্তরেও বীরভূমের ধাঁচে তৈরি হয়েছে কোর কমিটি। তাতে রয়েছেন ৯ সদস্য (আগে ৭ জন ছিলেন, তার সঙ্গে শ্রমিক সংগঠনের দুই নেতা – স্বপন সমাদ্দার ও জীবন সাহাকে যুক্ত করা হয়েছে)। অভিষেক জানান, এই পরিবর্তন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নির্দেশ মেনে এবং সকলের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতেই হয়েছে।

শুধু লোকসভায় জয়ের ভিত্তিতে নয়, সার্বিক ভাবে পরিশ্রমের দামও দিয়েছে তৃণমূল শিবির। অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, “যাঁরা হয়তো খুব চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সেই কেন্দ্রে আমরা আশানুরূপ ফল করতে পারিনি। তবে তাঁদের পরিশ্রমে খামতি ছিল না। তাঁদেরও পুরস্কৃত করা হয়েছে। যাঁরা দলের জন্য খেটেছেন, প্রাণপাত করেছেন, সারা বছর মানুষের কাছে যাঁরা সরকারের উন্নয়নমূলক কাজগুলিকে পৌঁছে দিয়েছেন, তাঁদের সকলকে পুরস্কৃত করার চেষ্টা করেছে দল।” কারও কারও পদ যাওয়ায় তারা ক্ষুব্ধ এবং দলে গুরুত্ব কমল বলে মনে করছেন। এনিয়ে প্রশ্নের জবাবে অভিষেকের বন্তব্য, “যাঁরা দলের কাজে অবহেলা করেছেন, তাঁদের গুরুত্ব তো কমবেই। তবে সবাই মিলেই দলের কাজ করতে হবে। এখন ভাবলে হবে না, কে বাদ পড়ল আর কার গুরুত্ব বাড়ল।”

সামগ্রিকভাবে, আগামী বিধানসভা ভোটের আগে তৃণমূলের এই সাংগঠনিক রদবদলকে একটি পারফরম্যান্স-ভিত্তিক কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে পরিশ্রমীদের পুরস্কার এবং অবহেলাকারীদের বার্তা স্পষ্ট করে দিয়েছে দলীয় নেতৃত্ব।