বিশেষ: ‘আকাশকন্যা অ্যামেলিয়া’ যার হারিয়ে যাওয়া আজও রহস্য, সকলকে অবাক করে সেই ঘটনা

১৯৩৭ সালের ২রা জুলাই। প্রশান্ত মহাসাগরের অসীম নীল জলরাশির ওপর দিয়ে উড়তে উড়তে হঠাৎই যেন মিলিয়ে গেলেন তিনি। একজন বৈমানিক, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা, আর নারীর অসীম সাহসের জ্বলন্ত প্রতীক – অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট। তাঁর বিমান যোগে বিশ্ব পরিক্রমার অসমাপ্ত যাত্রা আর রহস্যময় অন্তর্ধানের আজ প্রায় ৮৭ বছর হয়ে গেল, তবু আজও তিনি বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষের কাছে এক অফুরন্ত প্রেরণা, এক অমলিন কিংবদন্তী।

১৮৯৭ সালের ২৪শে জুলাই কানসাসের অ্যাটচিসনে জন্ম নেওয়া অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট ছোটবেলা থেকেই ছিলেন ব্যতিক্রমী। সমাজের বেঁধে দেওয়া গৎবাঁধা নিয়মের বাইরে বেরিয়ে নিজের পথ তৈরি করার সাহস তাঁর মধ্যে ছোট থেকেই ছিল। বাবা ছিলেন রেলওয়ের কর্মী আর মা চাইতেন মেয়েরা যেন সমাজের প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে নিজেদের পরিচিতি তৈরি করে। মা ও মেয়ের এই অসাধারণ বোঝাপড়া অ্যামেলিয়াকে সাহস জুগিয়েছিল নিজের ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিতে।

১৯২০ সালে একটি বিমান মেলায় প্রথমবারের মতো প্লেন দেখেন অ্যামেলিয়া। মাত্র ১০ মিনিটের একটি বিমান ভ্রমণ তাঁর জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেয়। সেই মুহূর্তেই তিনি বৈমানিক হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তৎকালীন সমাজের নানা প্রতিকূলতা, বিশেষ করে একজন নারীর জন্য বিমান চালনাকে পেশা হিসেবে বেছে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ এবং অর্থনৈতিক বাধা সত্ত্বেও তিনি নিজের স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে অটল থাকেন।

অ্যামেলিয়া কেবল একজন বৈমানিকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন নারীদের এগিয়ে যাওয়ার প্রতীক। ১৯৩২ সালে প্রথম আমেরিকান নারী হিসেবে একা বিমান চালিয়ে উত্তর আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তিনি এক ঐতিহাসিক সাফল্য অর্জন করেন। এই দুঃসাহসিক ফ্লাইট তাঁকে রাতারাতি বিশ্বজোড়া খ্যাতি এনে দেয় এবং নারীদের জন্য সম্ভাবনার নতুন দরজা খুলে দেয়। অ্যামেলিয়ার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, “নারীরা যদি চায়, তারা যে কোনো কিছু করতে পারে।” তিনি ছিলেন নারীদের অধিকার আদায়ের একজন সোচ্চার কণ্ঠস্বর এবং কর্মক্ষেত্রে সাহস ও আত্মবিশ্বাসের গুরুত্ব বোঝাতেন। তাঁর মতে, কাজে সাহস না থাকলে জীবন অনেকটা স্বাদহীন হয়ে যায়।

১৯৩৭ সালে অ্যামেলিয়া তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী মিশন শুরু করেন – বিমান যোগে পৃথিবী প্রদক্ষিণ। নেভিগেটর ফ্রেড নুনানকে সঙ্গে নিয়ে শুরু হওয়া এই যাত্রা প্রায় ঠিকঠাকই এগোচ্ছিল। তারা চেয়েছিলেন আকাশপথে গোটা বিশ্বকে যেন এক সুতোয় বেঁধে ফেলতে। কিন্তু ২রা জুলাই, যখন তারা প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে হাওল্যান্ড দ্বীপের দিকে যাচ্ছিলেন, তখনই তাঁদের বিমানের সাথে রেডিও যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তারপর থেকে অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট আর ফিরে আসেননি। পৃথিবী হারিয়ে ফেলে তার এক আকাশকন্যাকে। তাঁর সন্ধানে বিশাল অনুসন্ধান চালানো হয়, কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ হয়।

অ্যামেলিয়ার নিখোঁজ হওয়া আজও ইতিহাসের এক অন্যতম অমীমাংসিত রহস্য। তাঁর ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা নিয়ে বিভিন্ন তত্ত্ব প্রচলিত আছে – কেউ মনে করেন দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়ার সময় বিমান দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়েছে, কেউ বলেন তিনি হয়তো কোনো অজানা দ্বীপে জরুরি অবতরণ করে বন্দি হয়েছিলেন, আবার কারো কারো বিশ্বাস তিনি হয়তো বেঁচে ছিলেন এবং লোকচক্ষুর আড়ালে আত্মগোপন করেছিলেন কারো সহানুভূতির আশায়। কিন্তু সত্যিটা আজও প্রশান্ত মহাসাগরের গভীর নীল জলে হারিয়ে আছে।

৮৭ বছর আগে রহস্যময়ভাবে হারিয়ে গেলেও অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্টের গল্প, তাঁর অদম্য সাহস আর স্বপ্ন আজও অমলিন। তিনি বেঁচে আছেন বিশ্বের প্রতিটি সাহসী নারীর চোখে, প্রতিটি স্বপ্নবাজ মানুষের মনে। জীবনের নানা বাধা পেরিয়ে স্বপ্নের আকাশে উড়ার সাহস যোগাতে তিনি আজও এক ফিসফিসানির মতো শোনা যান। তিনি যেন বলে যান, “যদি তুমি স্বপ্ন দেখো, তবে উড়তে শেখো। কারণ আকাশ শুধু পাখিদের জন্য নয়, সাহসীদের জন্যও।” এভাবেই বৈমানিক অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট ইতিহাসের পাতায় এবং আমাদের হৃদয়ে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে বেঁচে আছেন, যিনি প্রমাণ করে গেছেন স্বপ্নের কোনো সীমা নেই, আর সাহস কখনো হারায় না।

তথ্যসূত্র: স্মিথসোনিয়ান ন্যাশনাল এয়ার অ্যান্ড স্পেস মিউজিয়াম, দ্য অফিসিয়াল অ্যামেলিয়া ইয়ারহার্ট, হিস্টরি ডট কম, ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক।