DA মামলার খুঁটিনাটি, কী হলো সুপ্রিমকোর্টে? কী করতে হবে রাজ্য সরকারকে ? জেনেনিন বিস্তারিত

তিন বছরের দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে বকেয়া মহার্ঘভাতা (ডিএ) নিয়ে রাজ্য সরকারি কর্মচারীরা খানিকটা স্বস্তি পেলেন। আর সুপ্রিম কোর্টের এক অন্তর্বর্তী নির্দেশে প্রবল চাপের মুখে পড়ল পশ্চিমবঙ্গ সরকার। ২০২২ সালের ২০ মে থেকে শুরু হওয়া এই আন্দোলন শুক্রবার, ১৬ মে ২০২৫ তারিখে শীর্ষ আদালতের নির্দেশে নতুন মাত্রা পেল।

শুক্রবার সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সঞ্জয় কারোল ও বিচারপতি সন্দীপ মেহতার ডিভিশন বেঞ্চ অন্তর্বর্তী নির্দেশে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে যে, ডিএ সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক অধিকার। আদালত নির্দেশ দিয়েছে যে, পঞ্চম বেতন কমিশনের আওতায় থাকা রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের ২০০৬ সালের ১ এপ্রিল থেকে ২০১৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের বকেয়া ডিএ-র ২৫ শতাংশ আগামী তিন মাসের মধ্যে মিটিয়ে দিতে হবে রাজ্যকে। এই টাকা মেটানোর জন্য রাজ্য কী পদক্ষেপ করছে, তা হলফনামা দিয়ে চার সপ্তাহের মধ্যে শীর্ষ আদালতে জানাতে হবে। আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ২০১৫-এর ৩১ ডিসেম্বরের পর থেকে এখনও পর্যন্ত বকেয়া ডিএ-র ভাগ্য আগামী দিনে সুপ্রিম কোর্টের চূড়ান্ত শুনানিতে নির্ধারিত হবে।

এর আগে ২০২২ সালের মে মাসে কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি হরিশ ট্যান্ডন ও বিচারপতি রবীন্দ্রনাথ সামন্তের ডিভিশন বেঞ্চ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ মেটানোর সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিল। কিন্তু সেই রায় কার্যকর না-করে রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল। গত তিন বছরে ১৮ বার এই মামলা শুনানির জন্য তালিকাভুক্ত হলেও বিভিন্ন কারণে তা পিছিয়ে গিয়েছে। তবে সরকারি কর্মচারীরা তাঁদের আন্দোলন থেকে সরে আসেননি। সুপ্রিম কোর্ট এ দিন ডিএ-কে সরকারি কর্মচারীদের মৌলিক অধিকার বলে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা কর্মচারীদের দীর্ঘদিনের দাবির স্বপক্ষে একটি বড় জয়।

সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ পালন করতে হলে রাজ্যকে ১০ হাজার ৪৪২ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা খরচ করতে হবে বলে আদালতে জানান পশ্চিমবঙ্গ সরকারের তরফে বর্ষীয়ান কৌঁসুলি অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি ও আইনজীবী হুজ়েফা আহমেদি। তাঁরা জোরালো যুক্তি দেন যে, এই বিপুল পরিমাণ টাকা দিতে হলে রাজ্যের মেরুদণ্ড ভেঙে যাবে, যা কার্যত অসম্ভব। কিন্তু আদালত তাদের এই যুক্তি গ্রহণ করেনি এবং নিজেদের অবস্থান থেকে সরেনি। আইনজ্ঞদের একাংশের ব্যাখ্যা, সর্বোচ্চ আদালত সম্ভবত মনে করেছে যে রাজ্যের যথেষ্ট ফান্ড রয়েছে এবং এই বকেয়া মেটানোটা রাজ্যের জন্য বিরাট বোঝা নয়।

শুনানির সময় বিচারপতি কারোল রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে কিছুটা উষ্মার সুরে বলেন, “আপনারা কী চাইছেন? আমরা কি মামলা এখনই খারিজ করে দেবো চূড়ান্ত রায় দেবো?” বিচারপতি মেহতা মন্তব্য করেন, “যে সরকারি কর্মীরা চাকরিতে আছেন, তাঁদের সঙ্গে এই আচরণ করা যায় না, এই ভাবে ডিএ বকেয়া রাখা যায় না।” রাজ্য পক্ষ বারংবার আর্থিক সংকটের কথা বললেও, আদালত তাদের আবেদন খারিজ করে অন্তত ২৫ শতাংশ ডিএ মিটিয়ে দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতি কারোল রাজ্যের আইনজীবীর উদ্দেশে আরও প্রশ্ন করেন, “আপনি এটা ব্যাখ্যা করতে পারেননি যে, রাজ্য সরকার কেন কেন্দ্রীয় সরকারের মতো বছরে দু’বার তাদের কর্মীদের ডিএ দেয়নি।”

বর্তমানে রাজ্য সরকারের কর্মচারীরা ১৮ শতাংশ ডিএ পান, যেখানে কেন্দ্রীয় সরকারি কর্মীদের বর্তমান ডিএ-র হার ৫৫ শতাংশ। গত আর্থিক বছরে রাজ্য সরকারি কর্মীদের ডিএ-র হার ১৪ শতাংশ ছিল, যা ১ এপ্রিল থেকে চার শতাংশ বাড়িয়ে ১৮ শতাংশ করা হয়। এই বৈষম্য নিয়ে সরকারি কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করছেন। তাঁদের দাবি, ২০০৯ সালের রোপা (রিভিশন অফ পে অ্যান্ড অ্যালাউন্স) রুল মেনে অল ইন্ডিয়া কর্মাশিয়াল প্রাইস ইনডেক্সের ভিত্তিতে ডিএ নির্ধারিত হোক। তাঁদের এই মৌলিক দাবিতে সুপ্রিম কোর্ট এ দিন কার্যত সিলমোহর দিয়েছে বলে আইনজ্ঞরা মনে করছেন।

সুপ্রিম কোর্টের রায়ে স্বাভাবিক ভাবেই খুশি সরকারি কর্মচারীরা। অনেকে ব্যঙ্গের সুরে বলেছেন, “টাকা নেই আবার কী! মেলা-খেলায় খরচ হচ্ছে কী করে?” অন্যদিকে, এই রায়ের পর নবান্নের কর্তারা কার্যত মুখে কুলুপ এঁটেছেন। তাঁদের বক্তব্য, রায়ের কপি হাতে না পেলে কিছু বলা সম্ভব নয়। আইনজ্ঞদের ব্যাখ্যা, যেহেতু সুপ্রিম কোর্ট মামলাটির শুনানি করবে এবং তারা চূড়ান্ত রায় দেয়নি, তাই এখনই ‘রিভিউ’ বা ‘মডিফিকেশন’ অ্যাপ্লিকেশন করার সুযোগ রাজ্যের হাতে নেই।

সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের অন্তর্বর্তী নির্দেশ রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের বকেয়া ডিএ পাওয়ার পথে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একই সাথে এটি রাজ্য সরকারের উপর আর্থিক ও রাজনৈতিক চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। মামলাটির চূড়ান্ত শুনানি আগামী দিনে কী রায় নিয়ে আসে, এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছেন সকলে।