বিশেষ: ৬০ বছর আগে পাক বিমানঘাঁটিতে ‘ডগফাইট’, IAF পাইলটের কীর্তি ২৩ বছর ছিল অজানা

সম্প্রতি ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর অধীনে পাকিস্তানের বেশ কয়েকটি বিমানঘাঁটিতে হামলা চালিয়েছে ভারত। এর মধ্যে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের সারগোদায় অবস্থিত মুশাফ বিমানঘাঁটি অন্যতম লক্ষ্য ছিল। আকাশপথে এই হামলার পর উপগ্রহ চিত্রে ঘাঁটির রানওয়ের ব্যাপক ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। তবে সারগোদা ভারতের জন্য নতুন কোনো লক্ষ্যবস্তু নয়। আজ থেকে প্রায় ৬০ বছর আগে, ১৯৬৫ সালের ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময়েও এই ঘাঁটিতে হামলা হয়েছিল। আর সেই সময়কার সারগোদার আকাশেই হয়েছিল দুই দেশের বায়ুসেনার এক কিংবদন্তি ‘ডগফাইট’, যার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে ভারতীয় বায়ুসেনার স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়ার নাম।
অপারেশন সিঁদুর-এর সাম্প্রতিক হামলায় সারগোদা বিমানঘাঁটির ক্ষয়ক্ষতি নিশ্চিত হলেও, এই ঘটনা ফিরিয়ে এনেছে ১৯৬৫ সালের যুদ্ধের স্মৃতি। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর পাকিস্তানি বায়ুসেনা ভারতের আদমপুর, হালওয়ারা, পাঠানকোট এবং জামনগরের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিমানঘাঁটিতে আক্রমণ করে। এর পরের দিন, ৭ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বায়ুসেনা এর ভয়াবহ পাল্টা জবাব দেয়। সেই পাল্টা আক্রমণের অংশ হিসেবেই ভারতীয় বায়ুসেনার একটি স্কোয়াড্রন সারগোদা বিমানঘাঁটিতে বোমাবর্ষণ করতে গিয়েছিল।
সেই অভিযানের সময়ই এক অসাধারণ ঘটনা ঘটে। বোমাবর্ষণ শেষে বাকি পাইলটরা যখন ভারতের দিকে ফিরতে শুরু করেন, তখন স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়া পাকিস্তানের ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আমজাদ হোসেনের সঙ্গে আকাশে এক ভয়াবহ ডগফাইটে জড়িয়ে পড়েন। ডগফাইট হলো দুটি যুদ্ধবিমানের মধ্যে অত্যন্ত কাছ থেকে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণের লড়াই।
সেই সময় ভারতীয় বায়ুসেনার সম্বল ছিল পুরোনো যুগের ‘মিস্টেয়ার ৪ এ ফাইটার জেট’। অন্যদিকে, পাকিস্তান ব্যবহার করছিল সেই সময়ের নিরিখে বহু উন্নত এবং দ্রুতগামী ‘এফ-১০৪ স্টারফাইটার’। প্রযুক্তিগত দিক থেকে বহু পিছিয়ে থাকা বিমান নিয়েই স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়া তাঁর অসাধারণ দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দেন। তিনি অত্যাধুনিক পাক যুদ্ধবিমানটিকে ভূপাতিত করতে সক্ষম হন। পাকিস্তানি পাইলট আমজাদ হোসেন যদিও নিরাপদে বিমানটি থেকে ইজেক্ট করতে পেরেছিলেন। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, দেবায়ার ‘মিস্টেয়ার ৪ এ ফাইটার জেটটিও’ এই লড়াইয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ভেঙে পড়ে। পাইলটের আসনে বসেই শহীদ হন স্কোয়াড্রন লিডার দেবায়া। তবে সেদিন তিনি বুঝিয়ে দিয়েছিলেন যে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার জন্য শুধু উন্নতমানের যুদ্ধবিমানই যথেষ্ট নয়, পাইলটের অদম্য সাহস ও দক্ষতাটাই আসল।
দেবায়ার এই বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের কথা তাঁর স্কোয়াড্রনের বাকি পাইলটরা বা ভারতীয় নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সংস্থা তাৎক্ষণিকভাবে জানতে পারেনি। ফলে তাঁকে প্রাথমিকভাবে নিখোঁজ বলে ঘোষণা করা হয়েছিল। তাঁর এই আত্মত্যাগ এক ‘অজ্ঞাত নায়কের’ কাহিনি হয়ে চাপা পড়েছিল।
প্রায় দেড় দশক পর, ১৯৭৯ সালে ব্রিটিশ বিমান-ইতিহাসবিদ জন ফ্রিকারের লেখা বই ‘ইন্ডিয়া-পাকিস্তান এয়ার ওয়ার অফ ১৯৬৫’ প্রকাশিত হয়। বইটি পাকিস্তানের দৃষ্টিকোণ থেকে লেখা হলেও, তাতে ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট আমজাদ হোসেনের স্টারফাইটারের সঙ্গে একটি মিস্টেয়ার ৪ এ ফাইটার জেটের ডগফাইটের উল্লেখ ছিল। ফ্রিকার সেই মিস্টেয়ার পাইলটের প্রশংসা করে লিখেছিলেন যে তিনি প্রশংসনীয় সাহস দেখিয়েছিলেন এবং দক্ষতার সাথে লড়াই করে স্টারফাইটারকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে দিয়েছিলেন।
ফ্রিকারের এই বইটি পড়ার পর তৎকালীন ভারতীয় বায়ুসেনার ১ নম্বর স্কোয়াড্রনের কমান্ডিং অফিসার গ্রুপ ক্যাপ্টেন ওপি তানেজা বুঝতে পারেন। তিনি নিশ্চিত হন যে স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়াই সেদিন ওই অসম লড়াইটি লড়েছিলেন এবং পাক এফ-১০৪ বিমানটিকে ভূপাতিত করেছিলেন। কারণ, ওই অভিযানে যাওয়া একমাত্র তিনিই ফিরে আসেননি।
এরপর গ্রুপ ক্যাপ্টেন তানেজা বায়ুসেনার তৎকালীন প্রধান এয়ার মার্শাল ইদ্রিস হাসান লতিফকে চিঠি লিখে স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়ার নাম দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বীরত্বের পুরষ্কার, ‘মহাবীর চক্র’-এর জন্য সুপারিশ করেন। দীর্ঘ ২২ বছর পর, ১৯৮৮ সালে তাঁর স্ত্রী সুন্দরী দেবায়ার হাতে মরণোত্তর মহাবীর চক্র সম্মান তুলে দেওয়া হয়। স্কোয়াড্রন লিডার এবি দেবায়াই ভারতীয় বায়ুসেনার ইতিহাসে একমাত্র সদস্য যাকে মরণোত্তর মহাবীর চক্র প্রদান করা হয়েছে। সারগোদার আকাশ আজও তাঁর সেই বীরত্বের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে।