পাক হামলার আশঙ্কা, ফের একাধিক শহরে ফ্লাইট বাতিল ইন্ডিগো-এয়ার ইন্ডিয়ার

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কঠোর হুঁশিয়ারি এবং পরবর্তীতে ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হওয়ার পরও সীমান্তের ওপার থেকে উস্কানিমূলক কর্মকাণ্ড অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে পাকিস্তানের দিক থেকে ভারতীয় আকাশসীমায় ড্রোন পাঠিয়ে নজরদারি বা হামলার চেষ্টা ভারতের নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জনজীবনে নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। সর্বশেষ ঘটনা হিসেবে, সোমবার রাতে উত্তর ভারতের অন্তত দশটি ভিন্ন স্থানে পাকিস্তানের ড্রোন দেখা গেছে বলে সামরিক সূত্র থেকে দাবি করা হয়েছে। এই ঘটনা সীমান্তের সুরক্ষা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলেছে।

এই নতুন করে সৃষ্ট উত্তেজনার সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভারতের বিমান পরিষেবার উপর। নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে মঙ্গলবার দেশের দুটি প্রধান বিমান সংস্থা – এয়ার ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিগো – উত্তর ও পশ্চিম ভারতের একাধিক শহরে তাদের নির্ধারিত ফ্লাইট বাতিল করার ঘোষণা দিয়েছে। বাতিল হওয়া ফ্লাইটগুলোর তালিকায় রয়েছে শ্রীনগর, লে, যোধপুর, ভুজ, জামনগর, অমৃতসর, রাজকোট, চণ্ডীগড় এবং জম্মুর মতো গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলো। বিমান সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে যাত্রী ও বিমানের সুরক্ষার বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে কোনো রকম আপস করতে রাজি নয় তারা। ইন্ডিগো কর্তৃপক্ষ তাদের যাত্রীদের বিমানবন্দরে আসার আগেই নিজস্ব ওয়েবসাইট বা মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে ফ্লাইটের সর্বশেষ অবস্থা বা ‘ফ্লাইট স্ট্যাটাস’ দেখে নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানিয়েছে, যাতে যাত্রীরা অনাকাঙ্ক্ষিত ভোগান্তি এড়াতে পারেন।

পাকিস্তানের দিক থেকে আসা ড্রোনের কারণে কেবলমাত্র বিমানবন্দরগুলির কাজ ব্যাহত হচ্ছে না, এর ফলে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের বিস্তীর্ণ এলাকার স্বাভাবিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ এবং পণ্য পরিবহনে বিমান পরিষেবা একটি অপরিহার্য মাধ্যম। ফ্লাইট বাতিলের জেরে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কার্যকলাপে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

সোমবার রাতের ঘটনা আরও ভয়াবহ মোড় নেয় যখন জম্মুর তিনটি ভিন্ন স্থানে অস্ত্রবাহী ড্রোন দিয়ে হামলার চেষ্টা করা হয়। সীমান্তের ওপার থেকে ধেয়ে আসা এই পাকিস্তানি ড্রোনগুলিকে সময়মতো চিহ্নিত করে ভারতীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বা এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম সেগুলিকে ধ্বংস করতে সক্ষম হয়। এই সফল প্রতিরোধ সত্ত্বেও, নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতা হিসেবে সোমবার রাতে অমৃতসর এবং জম্মুর সাম্বা সহ কয়েকটি সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় পুনরায় ‘ব্ল্যাক আউট’ বা আলো নিভিয়ে দেওয়ার মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। এই ঘটনাগুলি আবারও প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের দিক থেকে নিরাপত্তা ঝুঁকি কতটা বাস্তব ও তাৎক্ষণিক।

এর আগে, হয়তো পাহেলগাঁও হামলার মতো কোনো ঘটনার প্রেক্ষিতে ভারত সরকার ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছিল। সেই সময়ে ভারতের মাটি লক্ষ্য করে পাকিস্তানের ক্রমাগত ড্রোন হামলার পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর এবং পশ্চিম ভারতের প্রায় ৩২টি বিমানবন্দর সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিতে হয়েছিল। পরে, গত ১০ তারিখে ভারত ও পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতিতে রাজি হওয়ার পর পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে ওই বিমানবন্দরগুলি পুনরায় খুলে দেওয়া হয়। কিন্তু বর্তমান ড্রোন কার্যকলাপ প্রমাণ করছে যে পাকিস্তানের মানসিকতায় কোনও মৌলিক পরিবর্তন আসেনি এবং তারা ক্রমাগত ভারতীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার পরীক্ষা নেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে একাধিক বিমানবন্দরকে উচ্চ সতর্কতায় থাকতে হচ্ছে এবং তাদের স্বাভাবিক কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটছে। বিমান সংস্থাগুলিও পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় বড় অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছে।

দেশের বিভিন্ন প্রান্তে জরুরি প্রয়োজন বা ব্যবসায়িক কাজে বিমান ব্যবহারকারী সাধারণ যাত্রীরা এই পরিস্থিতিতে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। হঠাৎ করে ফ্লাইট বাতিল হয়ে যাওয়ায় গন্তব্যে পৌঁছনো তাদের জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গুরুতর সমস্যা এবং চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মঙ্গলবারই একটি উচ্চ পর্যায়ের সরকারি বৈঠক অনুষ্ঠিত হতে চলেছে বলে সূত্রে খবর। সরকারের শীর্ষস্তর বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ নির্ধারণ করবে বলে আশা করা যায়।

প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বিমান চলাচলের ক্ষেত্রেও পাকিস্তানের আকাশসীমা একটি বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে প্রায় সব আন্তর্জাতিক উড়ানই এখন পাকিস্তানের আকাশসীমা এড়িয়ে পশ্চিম এশিয়া বা ইউরোপের দিকে যাতায়াত করছে। এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক ঘটনাবলীর পরিপ্রেক্ষিতে উত্তর ও পশ্চিম ভারতের আকাশসীমার কিছু অংশেও সাময়িক নিষেধাজ্ঞা বা বিধিনিষেধ জারি করা হয়েছে। এই জটিল পরিস্থিতিতে কলকাতা থেকে আন্তর্জাতিক উড়ানগুলোকেও বিকল্প পথ অবলম্বন করতে হচ্ছে। তারা প্রায়শই নাগপুর, মুম্বই হয়ে আরব সাগরের উপর দিয়ে পশ্চিম এশিয়া বা ইউরোপের দিকে যাত্রা করছে। এই দীর্ঘ পথ পরিবর্তন করার ফলে বিমান সংস্থাগুলোর জ্বালানি খরচ বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তা তাদের আর্থিক বোঝা বাড়িয়েছে। এছাড়াও, এই পরিবর্তিত ও দীর্ঘতর ফ্লাইট পথগুলি পরিচালনা করার জন্য কলকাতার এয়ার ট্র্যাফিক কন্ট্রোল (ATC) বা বিমান চলাচল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের উপর কাজের চাপও যথেষ্ট বেড়ে গেছে। সামগ্রিকভাবে, পাকিস্তানের দিক থেকে আসা নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জগুলি ভারতের অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিমান পরিষেবা এবং সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক কার্যকলাপকে বহুমুখী সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে।