“ডেড হ্যান্ড পরমাণু”-অস্ত্রটি পৃথিবী ধ্বংস করতে পারে মুহূর্তেই, জেনেনিন কোন দেশের কাছে আছে?

বিশ্ব রাজনীতিতে যখনই পারমাণবিক সংঘাতের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়, তখনই একটি ভয়ংকর শব্দ নতুন করে সামনে আসে—’ডেড হ্যান্ড’। এই স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থাটির ক্ষমতা এতটাই যে এটি একাই পৃথিবীর বেশিরভাগ শহর ধ্বংস করে দিতে পারে। সাম্প্রতিক ভারত-পাকিস্তান উত্তেজনা এবং তার আগে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পরিপ্রেক্ষিতে এই ‘ডেড হ্যান্ড’-এর প্রসঙ্গ আবারও আলোচিত হচ্ছে।

‘ডেড হ্যান্ড’ আসলে কী?

‘ডেড হ্যান্ড’, যা ‘পেরিমিটার’ নামেও পরিচিত, হলো সোভিয়েত ইউনিয়নের (বর্তমান রাশিয়া) তৈরি একটি স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক প্রতিশোধ ব্যবস্থা। স্নায়ুযুদ্ধের সময় নির্মিত এই সিস্টেমটি এমনভাবে তৈরি করা হয়েছিল যাতে রাশিয়া যদি পারমাণবিক হামলার শিকার হয় এবং দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়, তবুও এই ব্যবস্থা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পারমাণবিক অস্ত্র উৎক্ষেপণের নির্দেশ দিতে পারে।

এটি কীভাবে কাজ করে?

‘ডেড হ্যান্ড’ মূলত একটি রেডিও-নিয়ন্ত্রিত কমান্ড সিস্টেম হিসেবে কাজ করে। এটি সামরিক যোগাযোগ ব্যবস্থা, ভূকম্পন, বায়ুমণ্ডলের চাপ, বিকিরণের মাত্রা এবং পারমাণবিক বিস্ফোরণের তীব্রতা—এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে। যদি এই সংকেতগুলো একটি পারমাণবিক আক্রমণের ইঙ্গিত দেয়, তাহলে সিস্টেমটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি বিশেষ কমান্ড রকেট উৎক্ষেপণ করে। এই রকেটটি দেশের বিভিন্ন পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র ঘাঁটিতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণের আদেশ পাঠিয়ে দেয়, এমনকি যদি শত্রুপক্ষ রেডিও জ্যামিং করার চেষ্টা করেও। এর ফলে সমস্ত ইন্টারকন্টিনেন্টাল ব্যালিস্টিক মিসাইল (ICBM) একসঙ্গে উৎক্ষেপিত হয়।

এই ব্যবস্থা কতটা ধ্বংসাত্মক?

বর্তমানে রাশিয়ার হাতে আনুমানিক ১,৬০০ মোতায়েনযোগ্য কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র এবং আরও প্রায় ২,৪০০ আইসিবিএম-এ যুক্ত অস্ত্র রয়েছে। একটি মাত্র সংকেত পেলেই এই সমস্ত অস্ত্র ‘ডেড হ্যান্ড’-এর নিয়ন্ত্রণে চলে যেতে পারে। সুতরাং, একবার সক্রিয় হলে এই ব্যবস্থা রাশিয়ার ধ্বংসের পরেও সারা বিশ্বে বিধ্বংসী পারমাণবিক হামলা চালাতে সক্ষম।

কেন এই ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল?

এই সিস্টেমটি ‘পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংস’ (Mutually Assured Destruction – MAD) মতবাদের ভিত্তিতে তৈরি হয়েছিল। এই মতবাদের ধারণা হলো, যদি কোনো পক্ষ প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালায়, তাহলে প্রতিপক্ষও নিশ্চিতভাবে পাল্টা হামলা চালিয়ে উভয় পক্ষকেই ধ্বংস করে দেবে। এর ফলে কোনো দেশই প্রথমে পারমাণবিক হামলা চালানোর সাহস করবে না, যা এক প্রকার প্রতিরোধক হিসেবে কাজ করে।

এখনও কি এটি সক্রিয়?

রাশিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে কখনও এই ব্যবস্থার অস্তিত্ব স্বীকার করেনি। তবে ২০১১ সালে রাশিয়ার স্ট্র্যাটেজিক মিসাইল ফোর্সের জেনারেল সের্গেই কারাকায়েভ একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন যে এই ব্যবস্থা এখনও সক্রিয় রয়েছে। এর পাশাপাশি, রুশ সরকারি সংবাদমাধ্যমও বারবার ইঙ্গিত দিয়েছে যে এই সিস্টেমটিকে এখন হাইপারসনিক মিসাইল এবং আধুনিক রাডার সিস্টেম দিয়ে আরও উন্নত করা হয়েছে।

কেন ‘ডেড হ্যান্ড’ নিয়ে আবারও আলোচনা?

বর্তমান পরিস্থিতিতে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বারবার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিচ্ছেন এবং তাঁর দেশের পারমাণবিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্কতায় রেখেছেন। ফলে ‘ডেড হ্যান্ড’-এর মতো স্বয়ংক্রিয় পারমাণবিক ব্যবস্থাগুলো আবারও বিশ্ববাসীর উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।