“মা-বোনেদের মাথা থেকে সিঁদুর মুছে দেওয়ার পরিণতি টের পেল জঙ্গিরা”-প্রধানমন্ত্রী মোদী

পহেলগাঁও হামলার পর ভারতীয় সেনা কড়া প্রত্যাঘাত করে। পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরে নির্ভুল লক্ষ্যে স্ট্রাইক চালানো হয়। ভারতীয় স্থল, নৌ এবং বায়ুসেনার যৌথ অভিযানে ৯টি জঙ্গি ঘাঁটি সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হয় এবং শতাধিক জঙ্গি নিহত হয়। এরপর পাকিস্তান ভারতের উপর হামলা চালানোর চেষ্টা করলেও ভারতীয় সেনার তৎপরতায় তা রুখে দেওয়া হয়। সীমান্তে দুই দেশের মধ্যে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছিল, তবে শনিবার উভয় দেশ যুদ্ধবিরতি মেনে নিতে সম্মত হয়। এই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী জাতীর উদ্দেশে ভাষণ দেন।

প্রধানমন্ত্রী মোদীর ভাষণের মূল অংশগুলি ছিল নিম্নরূপ:

তিনি আবারও দেশের সেনা জওয়ান এবং সকল দেশবাসীর সংকল্পকে প্রণাম জানান। প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজ বুদ্ধপূর্ণিমা হলেও শান্তির পথ শক্তি দিয়েই প্রশস্ত হয়। দেশের মানুষ শান্তিতে বসবাস করুক, সেজন্য ভারতকে শক্তিশালী হওয়া অপরিহার্য। প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করতে ভারত পিছপা হবে না, এবং ভারত সেটাই করেছে।

পাকিস্তানের সাথে আলোচনার বিষয়ে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট জানিয়ে তিনি বলেন, যদি কথা হয়, তবে তা কেবল জঙ্গিবাদ এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীর নিয়েই হবে। সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না, ঠিক তেমনই সন্ত্রাস ও বাণিজ্য কিংবা জল ও রক্তও একসঙ্গে বইতে পারে না।

প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়ভাবে বলেন যে পাকিস্তানি সরকার ও সেনা যেভাবে জঙ্গিদের মদত দিচ্ছে, তাতে পাকিস্তান নিজেই একদিন শেষ হয়ে যাবে। পাকিস্তানের টিকে থাকার একমাত্র রাস্তা হলো জঙ্গিমুক্ত হওয়া; এছাড়া শান্তির আর কোনো পথ নেই। তিনি স্পষ্ট করেন যে এটি যুদ্ধের যুগ নয়, তবে সন্ত্রাসবাদ কোনোভাবেই সহ্য করা হবে না এবং এর যোগ্য জবাব দেওয়া হবে। যেকোনো ধরনের সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ভারতকে ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে এবং দেশের মানুষই সবার আগে।

মৃত জঙ্গিদের প্রতি পাকিস্তানি অফিসারদের শ্রদ্ধা জানানোর ঘটনা থেকে অনেক কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন। যারা সন্ত্রাসবাদীদের আশ্রয় দেয় সেই সরকার এবং জঙ্গিদের ভারত আলাদাভাবে দেখে না, ভারতের কাছে তারা এক।

ভারত কোনো পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল সহ্য করবে না এবং আক্রমণের শিকার হলে ভারত পাল্টা সঠিক প্রহার করবে। যারা হামলা চালাবে তাদের উপরেই হামলা হবে এবং ভারত নিজেদের মতো করে জবাব দেবে।

প্রধানমন্ত্রী জানান, ভারতীয় সৈন্যরা সর্বদা সতর্ক রয়েছে। সার্জিক্যাল স্ট্রাইক ও এয়ার স্ট্রাইকের পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে ভারত তার নীতি বিশ্বের কাছে স্পষ্ট করে দিয়েছে। আগামী দিনে ভারত পাকিস্তানকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। পাকিস্তান যখন যুদ্ধবিরতির আবেদন জানায় এবং কোনো দুঃসাহস না দেখানোর প্রতিশ্রুতি দেয়, তখনই ভারত বিষয়টি বিবেচনা করে।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, প্রথম তিন দিনে ভারত পাকিস্তানকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছিল, যার ফলে পাকিস্তান বাঁচার পথ খুঁজছিল। সে কারণেই ১০ মে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ভারতের ডিজিএমও-র সাথে যোগাযোগ করে। ভারতের পদক্ষেপে পাকিস্তানের মনোবল ভেঙে গেছে, তাই তারা ভারতের বিরোধিতা করে স্কুল, কলেজ, মন্দিরসহ বেসামরিক ও সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছিল। তবে পাকিস্তান শিক্ষা পেয়েছে, বিশ্ব দেখেছে কীভাবে ভারত পাকিস্তানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে।

দেশের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় হামলার জন্য দায়ী সন্ত্রাসবাদীরা ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ নিহত হয়েছে। ভারতের এই হামলায় ১০০-র বেশি জঙ্গি, যার মধ্যে অনেক শীর্ষ নেতাও ছিল, নিকেশ হয়েছে। পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে ভারতের সেনারা তাদের মনোবল ভেঙে দিয়েছে। দেশ ঐক্যবদ্ধ থাকলে বড় পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব বলে তিনি জোর দেন।

‘অপারেশন সিঁদুর’-এর ফলাফল বিশ্ব প্রত্যক্ষ করেছে। ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকিস্তানের জঙ্গি ঘাঁটিগুলোতে এমনভাবে হামলা চালিয়েছে যা জঙ্গিরা স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি। দেশের মা-বোনের মাথা থেকে সিঁদুর মুছে দেওয়ার পরিণাম আজ জঙ্গিরা বুঝতে পেরেছে। ‘অপারেশন সিঁদুর’ ন্যায়ের অখণ্ড প্রতিজ্ঞা। এই অভিযানের জন্য তিনি সেনা জওয়ানদের স্যালুট জানান এবং তাঁদের পরাক্রম দেশ ভুলবে না বলে উল্লেখ করেন।

এদিকে, এয়ার মার্শাল এ কে ভারতী এক সাংবাদিক সম্মেলনে জানান যে ভারতীয় সেনাবাহিনী চীনের ক্ষেপণাস্ত্র পিএল-১৫ ভূপতিত করেছে এবং লেজার বন্দুক দিয়ে পাকিস্তানি ড্রোন ধ্বংস করেছে। তিনি আরও বলেন, ভারতীয় বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী এবং বিগত কয়েক বছরে সেনাবাহিনীর আধুনিকীকরণ করা হয়েছে। ভারতী স্পষ্ট করেন যে তাদের লড়াই সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ছিল, কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনী এটিকে তাদের লড়াইয়ে পরিণত করায় ভারতকে জবাব দিতে হয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে ৭ মে জঙ্গিদের আস্তানায় আক্রমণ করা হয়েছিল, কিন্তু পাকিস্তান জঙ্গিদের সমর্থন করে এই লড়াইকে নিজেদের লড়াই বানিয়ে নেয়, তাই তাদের প্রতিহত করা জরুরি ছিল। পাকিস্তানের ছোড়া চীনা ক্ষেপণাস্ত্রও ব্যর্থ হয়েছে বলে তিনি জানান।

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কমলেও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে নিয়মিত প্রেস ব্রিফিং অব্যাহত ছিল। এই ঘটনার পর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর জাতির উদ্দেশে ভাষণের দিকে পুরো দেশ অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিল।