গুঁড়িয়ে গেল জইশ-লস্করের আস্তানা! ‘পাকিস্তানই জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল’ বললেন বিদেশ সচিব, ৯ জঙ্গি ঘাঁটিতে পরিকল্পিত হামলা ভারতের

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁও-এ নিরীহ পর্যটকদের উপর বর্বরোচিত হামলার যোগ্য জবাব দিয়েছে ভারত। মঙ্গলবার মধ্যরাতে ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে এক সুপরিকল্পিত অভিযানে পাকিস্তানের ভেতরে ঢুকে অন্তত নয়টি জঙ্গি ঘাঁটি পর পর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এই পদক্ষেপের মাধ্যমে সন্ত্রাসবাদী কার্যকলাপে ভারত যে জিরো টলারেন্স নীতি মেনে চলে, তা আবারও প্রমাণিত হলো। এই ঘটনার কয়েকঘণ্টা পর সাংবাদিক বৈঠক করে দেশের বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি এই অভিযানের বিস্তারিত তথ্য এবং তার প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা করেছেন।

বৈঠকে বিদেশ সচিব বিক্রম মিশ্রি পহেলগাঁওয়ের ঘটনাকে ‘অতিবর্বরতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এই হামলা ছিল কাশ্মীরবাসীদের ফের অন্ধকারে ঠেলে দেওয়ার জন্য এবং উপত্যকার পর্যটনকে মুখ থুবড়ে ফেলে দেওয়ার একটি কৌশল। ধর্ম যাচাই করে পর্যটকদের খুন করা হয়েছে, যা সাম্প্রদায়িক হিংসা ছড়ানোর একটি ঘৃণ্য প্রচেষ্টা। তিনি জানান, গত এপ্রিল মাসে পহেলগাঁওয়ে হামলার সময় জঙ্গিরা নাকি স্পর্ধা দেখিয়ে বলেছিল, “মোদিকে গিয়ে জানিয়ো”। সন্ত্রাসবাদীদের এই সরাসরি চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেছিল ভারত সরকার। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে এই অপরাধীদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।

বিদেশ সচিব জানান, ২৩ এপ্রিলই পহেলগাঁও হামলার প্রত্যাঘাতের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল এবং সমস্ত তথ্য জোগাড় করেই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। বারবার ভারতে হামলা হতে থাকে, তাই পাকিস্তানকে যোগ্য জবাব দেওয়া হয়েছে। তাঁর কথায়, এর আগেও সন্ত্রাসের শিকার ৩৫০-র বেশি ভারতীয় নাগরিক। পহেলগাঁওয়ে হামলা চালানো লস্কর-ই-তৈবার শাখা TRF ছিল। স্পষ্ট হয়ে গেছে যে জঙ্গিদের আশ্রয় দেয় পাকিস্তান। তিনি আবারও মনে করিয়ে দেন, মুম্বই হামলার পর সবচেয়ে বড় হামলা ছিল পহেলগাও হামলা।

এই ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর আওতায় ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনী মঙ্গলবার মধ্যরাতে পাকিস্তান ও পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মোট ৯টি জঙ্গি ঘাঁটিকে নিশানা করে। একযোগে স্থল, নৌ এবং বায়ুসেনা মিসাইল হামলা চালালো বলে খবর। বিশেষ করে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবস্থিত জঙ্গি ঘাঁটিগুলো ধ্বংস করার ক্ষেত্রে ভারতীয় বায়ুসেনা রাফাল যুদ্ধবিমান ব্যবহার করেছে। এই ঘাঁটিগুলি কোথাও ব্যবহার হত প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে, কোনওটা ছিল লঞ্চপ্যাড, আবার কোনওটা অনুপ্রবেশের পথ।  
এই অভিযানে ধ্বংস হওয়া ঘাঁটিগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিলাল ক্যাম্প, কোটলি, গুলপুর, বার্নালা ক্যাম্প, আব্বাস ক্যাম্প, সার্জাল ক্যাম্প- শিয়ালকোট, মেহমুনা ক্যাম্প- শিয়ালকোট, মার্কাজ তইবা মুরিদকে ও ভাওয়ালপুর- জইশ-ই মহম্মদের মূল কার্যালয়। এই ঘাঁটিগুলির মধ্যে বাহাওয়ালপুরে জইশ-ই-মহম্মদের ঘাঁটি, মুরিদকেতে লস্কর-ই-তৈবার ঘাঁটি, সারজালে জইশ ঘাঁটি, শিয়ালকোটে হিজবুল মুজাহিদিনের ঘাঁটি, বারনালায় লস্করের ঘাঁটি, কোটলিতে জইশ ও হিজবুলের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং মুজফ্ফরাবাদে লস্কর ও জইশের প্রশিক্ষণ শিবির বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

গোয়েন্দা সূত্রে খবর, এই হামলায় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ জন জঙ্গি নিহত হয়েছে। যদিও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে হতাহতের আনুষ্ঠানিক সংখ্যা এখনো জানানো হয়নি। তবে প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, এই অভিযানে কোনো পাকিস্তানি সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করা হয়নি এবং লক্ষ্য নির্ধারণ ও হামলায় যথেষ্ট সংযম বজায় রাখা হয়েছে। ভারতীয় সেনার এই অভিযানের পরই পাকিস্তান নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর পাল্টা গুলিবর্ষণ শুরু করে, যাতে পুঞ্চ অঞ্চলে ৩ জন ভারতীয় নাগরিক শহিদ হয়েছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। সমস্ত ভারতীয় বিমানচালক নিরাপদে ফিরে এসেছেন বলে বায়ুসেনার তরফে জানানো হয়েছে।

বিদেশ সচিবের বক্তব্য, হামলার দায় স্বীকার করার পরও পাকিস্তান দায় স্বীকার করেনি, উল্টে পাল্টা অভিযোগ করেছে এবং জঙ্গি দমনে কোনও পদক্ষেপ করেনি। এই পরিস্থিতিতে পদক্ষেপ করেছে ভারত। তাঁর কথায়, এখন এটা স্পষ্ট যে পাকিস্তান জঙ্গিদের আশ্রয়স্থল। বিশ্বজুড়ে তারা এই ধরনের জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়ে আসছে বহুদিন ধরে। এনিয়ে আর কোনও সন্দেহ নেই। ডিসেম্বর ২০২৩-এও টিআরএফ নিয়ে সচেতন করেছিল ভারত এবং ইউএস সিকিওরিটি কাউন্সিলের বৈঠকে এনিয়ে আলোচনাও হয়েছিল, তারপরই এমন ঘটনা ঘটল।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাঁর বাসভবনে বসেই গোটা অপারেশনে নজরদারি চালান। কেন্দ্রীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং স্থল, নৌ এবং বায়ু সেনা, তিন বাহিনীর প্রধানের সঙ্গে কথা বলেন। ভারতীয় সেনাও তাদের এক্স হ‍্যান্ডলে পোস্ট করে লিখেছে, ‘ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, জয় হিন্দ’। লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী থেকে শুরু করে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সহ বিরোধী দলের নেতারা এবং চলচ্চিত্র জগতের তারকারাও ভারতীয় সেনার এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং সেনার প্রতি গর্ব প্রকাশ করেছেন।

অন্যদিকে, ভারতের হামলা স্বীকার করে নেওয়া পাকিস্তান দাবি করেছে, ভারত ৬টি স্থানে ২৪টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ভারতের ‘অপারেশন সিন্দুর’ হামলায় ৮ জন নিহত এবং ৩৫ জন আহত হয়েছেন। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফও ভারতের এই প্রত্যাঘাতের কথা স্বীকার করেছেন।

পহেলগাঁও হামলার পর ‘অপারেশন সিঁদুর’-এর মাধ্যমে দ্রুত পাল্টা জবাব দিয়ে ভারত বিশ্বকে বার্তা দিয়েছে যে তারা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত এবং মারের বদলা নিতে তারা অনড়। এই অভিযানে জঙ্গি পরিকাঠামোর বড়সড় ক্ষতি হয়েছে এবং পাকিস্তানের মাটিতে সন্ত্রাসবাদের কালো হাত গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রাক্তন সেনাপ্রধান মনোজ মুকুন্দ নরভানের মন্তব্য ‘অভি পিকচার বাকি হ্যায়…’ সেই কঠোর বার্তারই পুনরাবৃত্তি করছে। তবে পাকিস্তানি সেনার কাপুরুষোচিত গুলিবর্ষণে ৩ জন ভারতীয় নাগরিকের মৃত্যু ঘটনার অন্য একটি দুঃখজনক দিক। এই ঘটনার পর নিয়ন্ত্রণ রেখায় উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।