পাকিস্তানী জঙ্গি কাসভের ট্রেনিং থেকে লাদেনের চাঁদা, ধংস্ব হওয়া লস্কর ঘাঁটিতে কী কী চলত?

পহেলগাঁওতে নৃশংস সন্ত্রাসী হামলার যোগ্য জবাব দিতে মঙ্গলবার গভীর রাতে পাকিস্তানে সামরিক অভিযান চালাল ভারত। ভারতীয় সেনার তিন বাহিনীর যৌথ উদ্যোগে পাকিস্তান এবং পাক অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) একাধিক জঙ্গি ঘাঁটি লক্ষ্য করে এই ‘ফোকাসড অ্যান্ড প্রিসাইজ’ হামলা চালানো হয়। ‘অপারেশন সিঁদুর’ নামে এই অভিযানে পাকিস্তানের ভিতরে ঢুকে মোট ন’টি সন্ত্রাসবাদী আস্তানা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ছিল লস্কর-ই-তৈবার সেই কুখ্যাত সদর দফতরটিও, যা তৈরি করতে কুখ্যাত জঙ্গি ওসামা বিন লাদেন এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিল বলে জানা যায়।

ভারত এই হামলায় প্রধানত জইশ-ই-মুহাম্মদ (JeM), লস্কর-ই-তৈবা (LeT) এবং হিজবুল মুজাহিদিন—এই তিনটি বড় জঙ্গি সংগঠনের ঘাঁটিগুলোকে নিশানা করেছে। ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং (RAW) দীর্ঘদিন ধরে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে এই সমস্ত ঘাঁটির উপর নজরদারি চালাচ্ছিল এবং হামলার জন্য প্রতিটি লক্ষ্যবস্তু সুনির্দিষ্টভাবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

কোথায় কোথায় আঘাত হানা হয়েছে?

সবচেয়ে বড় আঘাত হানা হয়েছে জইশ-ই-মুহাম্মদের সদর দফতর ‘মারকাজ সুবহান আল্লাহ’-তে, যা পাকিস্তানের বাহাওয়ালপুরে অবস্থিত। আন্তর্জাতিক সীমান্ত থেকে মাত্র ১০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই ঘাঁটিটি ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলার জন্য জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল, যেখানে আমাদের ৪০ জন সিআরপিএফ জওয়ান শহিদ হয়েছিলেন। এখানেই মাওলানা মাসুদ আজহার সম্প্রতি জইশ ক্যাডারদের সামনে ভারত-বিরোধী উস্কানিমূলক বক্তব্য দেয়।

আরেকটি বড় হামলা চালানো হয়েছে লস্কর-ই-তৈবার সদর দফতর ‘মারকাজ-ই-তৈবা’-তে, যা লাহোর থেকে প্রায় ৩৩ কিলোমিটার দূরে ঐতিহাসিক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোডের ধারে মুরিদকেতে অবস্থিত। প্রায় ২০০ একর এলাকা জুড়ে বিস্তৃত এই কমপ্লেক্সটি বিশ্বের বৃহত্তম সন্ত্রাসবাদী আস্তানাগুলির মধ্যে অন্যতম হিসেবে পরিচিত ছিল। জানা যায়, ১৯৮০-র দশকের শেষের দিকে পাকিস্তানের আইএসআই এবং বিভিন্ন বিদেশি সংস্থার আর্থিক সহায়তায় লস্করের প্রধান হাফিজ সাইদ এটি নির্মাণ করেন। এখানেই কুখ্যাত জঙ্গি ওসামা বিন লাদেন মসজিদ এবং অতিথিশালা নির্মাণের জন্য এক কোটি টাকা অনুদান দিয়েছিল বলে তথ্য রয়েছে। ২০০৮ সালের মুম্বই সন্ত্রাসী হামলার সঙ্গে যুক্ত সকল অপরাধী, এমনকি আজমল কাসাভও এই ঘাঁটিতেই প্রশিক্ষণ পেয়েছিল। এই কমপ্লেক্সে একটি আধুনিক শহরের মতো সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ছিল, যার মধ্যে মসজিদ, স্কুল, প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, হাসপাতাল, অফিস এবং ব্যাংকও অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীরের (PoK) ভিতরেও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ হামলা চালানো হয়েছে। তাংধার সেক্টরে লস্করের সাওয়াই ক্যাম্পে আঘাত হানা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক পহেলগাঁও হামলার মতো বড় হামলার সঙ্গে যুক্ত ছিল। এছাড়াও পুঞ্চ-রাজৌরি এলাকার গুলপুর, জইশ-ই-মুহাম্মদের লঞ্চপ্যাড বিলাল ক্যাম্প, রাজৌরি সীমান্তের উলটো দিকে লস্করের আত্মঘাতী জঙ্গি প্রশিক্ষণ ক্যাম্প কোটলি ক্যাম্প, বারনালা ক্যাম্প, সাম্বা-কাথুয়া সীমান্তের সারজাল ক্যাম্প এবং সিয়ালকোটের কাছে হিজবুল মুজাহিদিনের প্রশিক্ষণ ঘাঁটি মেহমুণা ক্যাম্পে হামলা চালানো হয়েছে।

পাকিস্তানের আইএসআইয়ের তত্ত্বাবধানে এই সমস্ত ঘাঁটিতে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ চলত। জইশের বাহাওয়ালপুর সদর দফতরের মতোই মুরিদকের এই বিশাল কমপ্লেক্সটি ছিল লস্করের আদর্শ প্রচার, লজিস্টিক সরবরাহ এবং বিভিন্ন সন্ত্রাসবাদী অভিযানের মূল কেন্দ্র, যেখানে পাকিস্তান এবং কাশ্মীর সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তরুণ-তরুণীদের এনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো।

এই সফল অভিযানের পর ভারতীয় সেনাবাহিনী এক্স হ্যান্ডলে ‘জাস্টিস ইস সার্ভড’ লিখে একটি বার্তা পোস্ট করেছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, পহেলগাঁও হামলার তীব্রতার কথা মাথায় রেখে ভারত এবার সরাসরি জঙ্গিদের মূল পরিকাঠামোতে আঘাত হেনেছে। এই সফল অভিযানের মাধ্যমে ভারত আবারও স্পষ্ট বার্তা দিল যে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে তারা পিছপা হবে না এবং দেশের সুরক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ নিতে সর্বদা প্রস্তুত।