“কেস খেলে খাব, হেলমেট পরব না”-টাকা বাঁচাতে কেউ কিনছে সস্তার হেলমেট, বাড়ছে প্রাণঝুঁকি

‘লক্ষ্যে পৌঁছে তবেই হেলমেট খুলুন’— রাজস্থান রয়্যালসের ১৪ বছর বয়সী ব্যাটসম্যান বৈভব সূর্যবংশীর হেলমেট পরা এই ছবিটি কলকাতা পুলিশের ফেসবুক পেজে পোস্ট হওয়ার পরেই দ্রুত ভাইরাল হয়েছে। ভার্চুয়াল জগতে হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব নিয়ে পুলিশের এমন অভিনব সচেতনতা প্রচার প্রশংসা কুড়িয়েছে বটে, কিন্তু মাঠের বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া কঠিন। শহরের রাজপথে হেলমেট পরার ক্ষেত্রে অনীহা ও আইন ভাঙার ছবিটা এখনও চরম হতাশাজনক।

অদ্ভুত সব অজুহাত, জরিমানা মেনেই ঝুঁকি

গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে হেলমেট খোলা তো দূরের কথা, ট্রাফিক পুলিশের হাতে ধরা পড়লে বাইক চালকরা নানা রকম অদ্ভুত এবং হাস্যকর অজুহাত দেন। পুলিশকর্মীদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, কেউ বলেন “অনেকক্ষণ হেলমেট পরে থাকলে নাকি মাথা ধরে যায়”, আবার কেউ সার্জেন্টকে দেখেই মুখ কাঁচুমাচু করে বলেন “হেলমেট পরলে চুল উঠে যাচ্ছে!” পুলিশের কাছে ধরা পড়ে বারবার জরিমানা দিতে হলেও, কলকাতার কিছু কিছু এলাকার বাইক চালকরা যেন পণ করেছেন— “কেস খেলে খাব, কিন্তু হেলমেট পরব না!” বর্তমানে হেলমেট না পরার জন্য জরিমানার অঙ্ক অনেকটাই বেড়েছে, ₹৫০০ টাকা পর্যন্ত গুনতে হচ্ছে। তারপরেও অনেকে জীবন বাজি রেখে হেলমেট ছাড়াই বাইক চালাচ্ছেন। পুলিশ কর্তারা জানাচ্ছেন, শুধুমাত্র হেলমেট পরা নয়, সঠিক এবং নিরাপদ হেলমেট কেনার ক্ষেত্রেও জনসাধারণের মধ্যে সচেতনতার বড়সড় অভাব রয়েছে।

সস্তা হেলমেটের খোঁজে আপস

সোমবার ওয়েলিংটন মোড়ের কাছে একটি হেলমেটের দোকানে গেলে হেলমেট কেনার ক্ষেত্রে এই উদাসীনতারই একটি চিত্র ধরা পড়ে। লেনিন সরণির একটি দোকানে বছর তিরিশের এক যুবক প্রবেশ করে হেলমেট চাইলে দোকানের কর্মী তাঁকে জিজ্ঞেস করেন, “কোন কোম্পানি, হাফ না ফুল? কেমন হেলমেট চাইছেন?” যুবক জবাব দেন, “আমার দুটো হেলমেট লাগবে, হাজারের মধ্যে ভালো দেখে দিন।” অর্থাৎ, দুটো হেলমেটের জন্য তাঁর বাজেট ছিল মাত্র ১০০০ টাকা। বিক্রেতা সঙ্গে সঙ্গে জানান যে, এই দামে আইএসআই চিহ্ন দেওয়া ভালো মানের হেলমেট পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু বাজারে টিকে থাকার তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে অনেক দোকানদারকেই কম দামের হেলমেট রাখতে হচ্ছে। ওই যুবকও দর কষাকষি করে ১০০০ টাকার জায়গায় ১৩০০ টাকায় দুটি হেলমেট কেনেন।

মানের সঙ্গে সমঝোতা, বিপদে অকার্যকর

রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের এক দোকানদার এই প্রসঙ্গে বলেন, “সবাই তো আর দামি এবং ভালো মানের হেলমেট কিনতে পারেন না। তাই বাধ্য হয়েই কোয়ালিটির সঙ্গে আপস করতে হয়। অনেকে হালকা এবং নিম্নমানের হেলমেট কিনে নিয়ে যান। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি, দুর্ঘটনা ঘটলে এই ধরনের হেলমেট জীবন রক্ষায় তেমন কোনো কাজে আসে না।”

একদিকে পুলিশের সচেতনতা প্রচার এবং মোটা জরিমানা, অন্যদিকে মানুষের উদাসীনতা এবং সস্তা হেলমেট কেনার প্রবণতা— এই দুইয়ের ফারাকই কলকাতার পথে বাইক আরোহীদের জীবন ঝুঁকির মুখে ফেলছে। জনসচেতনতা বাড়ালেই এই সমস্যা দূর হতে পারে বলে মনে করছেন ওয়াকিবহাল মহল।