বিশেষ: বৃষ্টি-বজ্রপাতে ‘কই মাছ’ কেন মাটিতে উঠে আসে? জেনেনিন সেই মূল কারণ?

বর্ষা এলেই গ্রামের দিকে একটি অদ্ভুত দৃশ্যের দেখা মেলে। আষাঢ় বা শ্রাবণের প্রবল বর্ষণে আশেপাশের পুকুর, খাল বা বিল থেকে কই মাছ আচমকাই মাটির উপর উঠে আসে এবং লাফালাফি শুরু করে। স্থানীয় ভাষায় এই ঘটনাকে বলা হয় ‘মাছ উজানো’। আক্ষরিক অর্থে ‘উজান’ বলতে স্রোতের বিপরীতে যাওয়া বোঝায়, কিন্তু বৃষ্টির সময় মাছের ডাঙায় উঠে আসার এই আচরণের কারণ কী?

অবাক করা বিষয় হলো, ইন্টারনেট বা প্রচলিত বইয়ে এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য খুব বেশি পাওয়া যায় না। এই রহস্য উন্মোচন করতে হলে প্রথমে প্রাণিবিদ্যার একটি বিশেষ ধারণা, ‘ট্যাক্সিস’ সম্পর্কে জানতে হবে।

‘ট্যাক্সিস’ হলো প্রাণীর এক ধরনের দিকনির্দেশিত চলন। অর্থাৎ, বিভিন্ন পরিবেশগত উদ্দীপক (যেমন – আলো, তাপ, রাসায়নিক পদার্থ বা স্রোত) এর প্রভাবে প্রাণীর একটি নির্দিষ্ট দিকে ধাবিত হওয়া। কোনো উদ্দীপকের দিকে চললে তাকে ‘পজিটিভ ট্যাক্সিস’ বলা হয়। কই মাছের ক্ষেত্রে এটি পজিটিভ ট্যাক্সিস লক্ষ্য করা যায়। আর যখন কোনো প্রাণী স্রোতের দিকে চলে, তখন তাকে বলে ‘রিওট্যাক্সিস’, যা পজিটিভ ট্যাক্সিসেরই একটি প্রকার।

বৃষ্টির কারণে পুকুর বা নদী-নালার জলস্তর বেড়ে গেলে একটি স্রোতের সৃষ্টি হয়। কই মাছ এই স্রোতের অনুকূলে চলতে শুরু করে, যাকে প্রচলিত কথায় ‘নতুন জলে যাওয়া’ বলা হয়ে থাকে। এছাড়া, কই মাছের পাখনার গঠন বেশ শক্তিশালী হওয়ায় তারা মাটির উপর দিয়েও কিছুটা পথ চলাচল করতে পারে।

তবে এই আচরণের পেছনে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে। দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হলে পুকুর বা জলাশয়ের জলে অক্সিজেনের পরিমাণ এবং খাবারের সহজলভ্যতা কমে আসে। বৃষ্টির নতুন জল যখন পুরোনো জলে মেশে, তখন কই মাছ এই পরিবর্তন অনুভব করে এবং ভালো অক্সিজেন ও খাবারের সন্ধানে স্রোতের টানে বা ‘রিওট্যাক্সিস’-এর প্রভাবে নতুন জলের দিকে ধাবিত হয়।

কেবল কই মাছই নয়, শিং এবং মাগুর মাছও বৃষ্টির সময় স্রোতের দিকে বা পুকুরের পাড়ে উঠে আসার প্রবণতা দেখায়। সুতরাং, বর্ষায় কই বা অন্যান্য মাছের ‘উজানো’ কেবল একটি গ্রামীণ কিংবদন্তী নয়, বরং বৈজ্ঞানিকভাবে ব্যাখ্যাযোগ্য এক প্রাকৃতিক ঘটনা।