“ইঞ্জেকশনের দাম প্রায় ১৬ কোটি টাকা”-অস্মিকার মতোই আক্রান্ত আয়ুষ,পরিবার চাইছে সাহায্য

পূর্ব বর্ধমানের পূর্বস্থলী পাটুলির তহবাজার এলাকার বাসিন্দা আড়াই বছরের ছোট্ট শিশু আয়ুষ বর্ধন এক বিরল এবং মারণ জিনঘটিত রোগ স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফিতে (SMA) আক্রান্ত। এই রোগের চিকিৎসার জন্য প্রায় ১৬ কোটি টাকা মূল্যের একটি অত্যন্ত দামি ইঞ্জেকশন প্রয়োজন, যা জোগাড় করা সামান্য রোজগারের আয়ুষের বাবা-মায়ের কাছে একপ্রকার দুঃস্বপ্ন। এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কীভাবে সংস্থান হবে, তা ভেবেই দিশেহারা এই অসহায় পরিবারটি সকলের কাছে সাহায্যের আর্জি জানাচ্ছে।
কী এই Spinal Muscular Atrophy (SMA)? চিকিৎসার খরচ আকাশছোঁয়া
স্পাইনাল মাসকুলার অ্যাট্রফি (SMA) একটি মারাত্মক জিনঘটিত রোগ যা শিশুদের মেরুদণ্ড এবং মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষগুলিকে প্রভাবিত করে। এর ফলে মাংসপেশী ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যায় এবং শিশুরা তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নাড়াতে বা সচল রাখতে পারে না। ধীরে ধীরে তাদের হাঁটাচলার ক্ষমতা এমনকি শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়ার ক্ষমতাও লোপ পেতে থাকে। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, আয়ুষকে বাঁচাতে হলে ‘জোলজেন্সমা’ (Zolgensma) নামে একটি বিশেষ জিন থেরাপির ইঞ্জেকশন প্রয়োজন। এই ইঞ্জেকশনটি এই রোগের চিকিৎসায় অত্যন্ত কার্যকরী হলেও এর মূল্য আকাশছোঁয়া, প্রায় ১৬ কোটি টাকা। এই ইঞ্জেকশনটি ভারতে সহজলভ্য নয়, বিদেশ থেকে আনাতে হয়।
অসুখের সূত্রপাত ও রোগ নির্ণয়: পরিবারের লড়াইয়ের শুরু
আয়ুষের বাবা প্রশান্ত বর্ধন ভিডিওগ্রাফির কাজ করে সামান্য রোজগার করেন এবং মা সিন্থিয়া বর্ধন গৃহবধূ। আর্থিক অবস্থা এমনিতেই নড়বড়ে। এর মধ্যে ছেলের এমন মারণ রোগ ধরা পড়ায় তাদের রাতের ঘুম ছুটেছে। প্রশান্ত বলছিলেন, ‘ওর যখন পাঁচ মাস বয়স, তখন বুঝতে পারি কোথাও একটা সমস্যা রয়েছে। নিজে পা তুলতে পারত না।’ কলকাতার এক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে গেলেও রোগটি তখন ধরা পড়েনি। চিকিৎসক বলেছিলেন চিন্তার কিছু নেই, ছ’মাস পরে দেখতে। কিন্তু ছ’মাস পরে আয়ুষের শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়; সে হাতও তুলতে পারছিল না। আর দেরি না করে এরপর তারা ছেলেকে নিয়ে যান ভেলোরের বিখ্যাত সিএমসি (CMC)-তে। সেখানেই পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ধরা পড়ে যে ছোট্ট আয়ুষ বিরল জিনঘটিত রোগ SMA-তে আক্রান্ত।
১৬ কোটি টাকা জোগাড়ে সরকারের কাছে আর্জি, মিলছে না সমাধানসূত্র
ছেলের চিকিৎসার জন্য ১৬ কোটি টাকার মতো বিশাল অঙ্ক কীভাবে জোগাড় করবেন, তা ভেবেই অকূল পাথারে আয়ুষের পরিবার। প্রশান্ত জানান, তারা কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার সহ বিভিন্ন জায়গায় অর্থের জন্য আবেদন জানিয়েছেন। কলকাতার পিজির রেয়ার ডিজ়িজ কমিটির বোর্ডেও সমস্ত নথি নিয়ে গিয়েছিলেন। কেন্দ্রীয় সরকারের ক্রাউড ফান্ডিং প্ল্যাটফর্মে তালিকাভুক্তির আবেদন জানিয়েছেন এবং স্বাস্থ্য দপ্তর, মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দোপাধ্যায়ের কাছেও লিখিত আর্জি জানিয়েছেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় টাকা শেষ পর্যন্ত আদৌ জোগাড় হবে কি না, তা নিয়ে পরিবার এখনো অন্ধকারেই রয়েছে।
অস্মিকার দৃষ্টান্ত ও মায়ের আকুল আবেদন
একই বিরল রোগ SMA-তে আক্রান্ত রানাঘাটের ছোট্ট মেয়ে অস্মিকা দাসের চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় প্রায় ১৬ কোটি টাকা বিভিন্ন সহৃদয় ব্যক্তি ও সংস্থার সহায়তায় অনেকটাই জোগাড় করা সম্ভব হয়েছে। এই দৃষ্টান্ত আয়ুষের পরিবারকে আশাবাদী করেছে। আয়ুষের মা সিন্থিয়া বর্ধন এই পরিস্থিতিকে অত্যন্ত কঠিন উল্লেখ করে সকলের কাছে তার ছেলের পাশে দাঁড়ানোর জন্য আকুল আবেদন জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘বলে বোঝাতে পারব না এই পরিস্থিতি কতটা কঠিন। পাটুলি হাইস্কুল ও কিছু পরিচিত মানুষ কিছুটা আর্থিক সাহায্য করেছেন, কিন্তু চিকিৎসার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন।’ অস্মিকার পাশে যেভাবে সকলে দাঁড়িয়ে সেই অর্থ জোগাড় সম্ভব হয়েছে, সেইভাবেই তার ছেলের পাশেও সকলে দাঁড়ানোর জন্য তিনি আর্জি জানিয়েছেন। সিন্থিয়ার আকুতি, ‘আমারও আর্জি, এ ভাবেই আমার ছেলের পাশেও সকলে দাঁড়ান। তা হলে হয়তো আড়াই বছরের আয়ুষকে সুস্থ করে তুলতে পারব।’
আয়ুষের জীবন বাঁচাতে ১৬ কোটি টাকা জোগাড় করা এই নিম্নবিত্ত পরিবারের পক্ষে একার হাতে অসম্ভব। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং সহায়তাই পারে এই ছোট্ট প্রাণটিকে স্বাভাবিক জীবন ফিরিয়ে দিতে। পরিবারটি আশায় বুক বেঁধে আছে যে সহৃদয় মানুষজন এবং সংস্থাগুলি তাদের দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেবে।