বিশেষ: গ্রাম বাংলা থেকে ধীরে ধীরে যেভাবে হারিয়ে গেল যাত্রাপালা? জেনেনিন কারণ সমূহ

একটা সময় ছিল যখন গ্রামবাংলার বিনোদনের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল যাত্রাপালা। সন্ধ্যায় প্যান্ডেলের চারপাশে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত হাজার হাজার দর্শক, সানাইয়ের সুরে শুরু হতো গল্প। ছোট বড় সব বয়সীরা দল বেঁধে ছুটে যেত যাত্রাপালা দেখতে। কিন্তু কালের বিবর্তনে গ্রামবাংলার ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতির হাজার বছর ধরে মিশে থাকা এ বিনোদনের রূপ এখন প্রায় দেখাই যায় না। এতে করে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শিল্পী ও কলাকুশলী।
দর্শকের উৎকণ্ঠা আর টানটান উত্তেজনাকে পুঁজি করে এভাবেই এগিয়ে চলতো যাত্রা পালার গল্প, যেমন একাব্বর বাদশাহ আর তার উজিরের কথোপকথন। ‘শোনো উজির, আমি শুনলাম প্রজারা আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। কী ষড়যন্ত্র করছে এবং কেন করছে বলতে পারো?’ বাদশার এ প্রশ্নের উত্তরে উজির আমতা-আমতা করলেও অভয় পেয়ে যখন বলেন, ‘কী বলব জাঁহাপনা, আপনার ছেলে-মেয়ে নাই। খোদা আপনাকে আটকুঁড়ে করে রেখেছেন। প্রজারা বলছে, আপনার মুখদর্শনে অন্ন জোটে না, তাই সবাই এ রাজ্য ছেড়ে অন্যত্র চলে যাওয়ার কথা ভাবছে।’ এমন সংলাপ আর অভিনয় রাতের পর রাত জাগিয়ে রাখত দর্শকদের।
কিন্তু নব্বইয়ের দশকের পর থেকে ধীরে ধীরে অবক্ষয় শুরু হয় এই শিল্পের। যাত্রাপালায় অশ্লীলতার অনুপ্রবেশ ঘটে। অশ্লীল আইটেম গান প্রদর্শন শুরু হবার পর তা আর পরিবার পরিজনদের নিয়ে দেখার মতো পরিস্থিতি থাকেনি। এতে আস্তে আস্তে দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করে। নব্বইয়ের দশকে যাত্রাশিল্পে তথাকথিত ‘প্রিন্সেসদের’ দাপট বেড়ে যায়। এই কারণে বিভিন্ন সময়ে যাত্রার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি হয়, যা এই শিল্পের পতনে বড় ভূমিকা নেয়।
শুধু অশ্লীলতাই নয়, অসাধু যাত্রাপালা ব্যবসায়ীদের একাংশ জুয়া ও হাউজির মতো অবৈধ কার্যকলাপ চালু করে যাত্রাকে আরও কলুষিত করে। এতে করে সুস্থ বিনোদন সন্ধানীরা দূরে সরে যান। যাত্রাপালার নামে অশ্লীলতার অভিযোগ এতটাই বাড়তে থাকে যে, অনেক জেলা প্রশাসন আর যাত্রাপালার অনুমোদনই দিতে চায় না।
একদিকে যেমন হারিয়ে যেতে বসেছে যাত্রাপালা, অন্যদিকে যাত্রাপালার সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শিল্পী ও কলাকুশলী হয়ে পড়েছেন বেকার। প্রতিটি দলে শিল্পী, কলাকুশলী মিলিয়ে প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ জন লোক জড়িত থাকত। পালা মঞ্চস্থ না হওয়ায় এসব মানুষ এখন জীবিকার তাগিদে বাধ্য হয়ে যাত্রাপালার অভিনয় জগত থেকে সরে যাচ্ছেন বা অন্য পেশা খুঁজছেন।
যাত্রা দলগুলো তাদের অস্তিত্বের সংকট কাটাতে এখন বিকল্প ব্যবস্থা নিয়েছে। অনেক দল তাদের পুরাতন নাম বদলে দলের নাম রেখেছে ‘লোকনাট্যদল’ বা দলপ্রধানের নামে দলের নামকরণ করেছে। এছাড়া যাত্রার মঞ্চায়নের রীতিও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কিছুটা বদলানোর চেষ্টা চলছে। যেমন নরসিংদী জেলার কথাই ধরা যাক। সেখানে পুরোনো ও জনপ্রিয় অনেকগুলো যাত্রা দল ছিল। এখন মাত্র আটটি দল অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে, এবং তারা নাম পাল্টে ফেলেছে।
যাত্রাশিল্পীদের সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত সময়টা ছিল যাত্রাশিল্পীদের জন্য সুদিন। তারপর থেকেই আস্তে আস্তে এ শিল্পের প্রতি বাধা নিষেধ আসতে থাকে এবং অবক্ষয় ত্বরান্বিত হয়। ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। দেশে যেখানে একসময় ৩০০-এর বেশি সংগঠিত যাত্রা দল ছিল, এখন ৩০টি দলও নিয়মিতভাবে সংগঠিত হয়ে কাজ করছে না। প্রায় তিন বছর ধরে যাত্রাপালা প্রায় বন্ধ।
গ্রামবাংলার হাজার বছরের ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এই যাত্রাপালা আজ বিলুপ্তির পথে। এই শিল্পকে বাঁচাতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও দর্শকদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন শিল্পীরা।