পর্দায় খলনায়ক, বাস্তবে বহু গুণের অধিকারী, অভিনেতা সৌরভ শুক্লার জার্নি

পর্দায় তিনি পরিচিত মূলত খলনায়ক হিসেবে, তবে তাঁর কমিক টাইমিংও দারুণ। অভিনয়ে আসার আগে তাঁর ইচ্ছে ছিল টেবিল টেনিস খেলোয়াড়, চিত্রশিল্পী, ক্রিকেটার বা গায়ক হওয়ার। শেষমেশ তিনি থিতু হন সিনেমার জগতে। কেমন ছিল সেই পথচলা, বক্স অফিসকে তিনি কীভাবে দেখেন, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমা আর বলিউডের তুলনা – নানা বিষয় নিয়ে ইটিভি ভারতের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিনেতা সৌরভ শুক্লা।

‘রেইড ২’ এবং ফিরছে ‘তাউজি’

১ মে মুক্তি পেয়েছে ‘রেইড ২’। রাজ কুমার গুপ্তা পরিচালিত এই ছবিতে ফের একবার পর্দায় দেখা যাবে সৌরভ শুক্লাকে, সেই পরিচিত ‘তাউজি’ চরিত্রে। ছবি প্রসঙ্গে তিনি জানান, “অময় পট্টনায়েকের থেকে বদলা নেবো কি না, সেটা সিনেমা দেখেই বোঝা যাবে। সেটা এখনই বলব না। কারণ দর্শকরা এই ছবি দেখার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় রয়েছেন। ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রথম ছবি ‘রেইড’ (২০১৮) দর্শকদের ভালোবাসা পেয়েছে। সেই ছবিতে নেতিবাচক চরিত্রে অভিনয় করে আমার ভালো লেগেছে।”

ছোটবেলা ও স্বপ্নের জাল বোনা

উত্তরপ্রদেশের গোরখপুরে জন্ম হলেও মাত্র ২ বছর বয়সে বাবা-মায়ের সঙ্গে দিল্লি চলে আসেন সৌরভ শুক্লা। তাঁর মা যোগমায়া শুক্লা ছিলেন ভারতের প্রথম মহিলা তবলা বাদক। বাবা শত্রুঘ্ন শুক্লা ছিলেন আগ্রা ঘরানার সঙ্গীতশিল্পী। অভিনেতা বলেন, “গোরখপুর অনেক ছোটবেলায় ছেড়েছি। ৬-৭ মাস আগে প্রথমবার সেখানে গিয়েছি। সেখানে আমার নাটক ‘বরফ’ করতে গিয়েছিলাম। আমার ছোটবেলা খুব সুখের-মজার ছিল। আমার বাবা-মা দুজনেই সঙ্গীতশিল্পী ছিলেন। দুজনেই দিল্লি ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষকতা করেছেন। তাই একজন শিক্ষকের ঘরে যেমন পরিবেশ হওয়া দরকার তেমনই ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “ছোটবেলা থেকেই বাড়িতে শিল্প নিয়ে চর্চা দেখে বড় হয়েছি। ফলে সেই একটা ভাব আমার মধ্যে প্রথম থেকেই ছিল। তবে ছোটবেলায় অনেক কিছু হওয়ার স্বপ্ন দেখেছি। আমার আঁকার হাত ভালো ছিল। সবাই বলত বড় হয়ে পেইন্টার হব। সেটা আমি খুব সিরিয়াসলি নিয়েছিলাম। এরপর আর একটু বড় হলে খেলার প্রতি ঝোঁক বাড়ে। ক্রিকেট নিয়ে আগ্রহ বাড়ে। এমনকী, ঘরে প্রায়শই সঙ্গীতের চর্চা হত বলে গায়কও হতে চেয়েছিলাম। হতে চেয়েছিলাম টেবিল টেনিস প্লেয়ারও।”

অভিনয়ে হাতেখড়ি ও মুম্বইয়ের পথ

শিল্পী জানান, “আমার যখন ২০-২১ বছর বয়স তখন আমি থিয়েটারে যোগ দিই। বেশ কিছুদিন থিয়েটার করার পর আমার কাছে শেখর কাপুর পরিচালিত ‘ব্যান্ডিট কুইন’ (Bandit Queen)-এর প্রস্তাব আসে। পরিচালক এরপর আমাকে মুম্বই ডাকেন। সেখানে তেহকিকাত নামে এক সিরিজে অভিনয়ের সুযোগ আসে দূরদর্শনের জন্য। এইভাবেই আমি এসে পড়ি সিটি অফ ড্রিমস মুম্বইয়ে।”

শুরুর দিকের লড়াই: সুযোগ ও অভিজ্ঞতা

মুম্বইয়ে একদিনে খ্যাতি পাওয়া সহজ নয়। সৌরভ শুক্লাকেও কি স্ট্রাগল করতে হয়েছে? অভিনেতার জবাবে বলেন, “কোথাও যেতে হলে ট্রাভেল করতে হয়। ট্রাভেল ইজ আ ননস্টপ থিংস। যত ওপরের দিকে ওঠার সুযোগ আসবে তত স্ট্রাগল বাড়তে থাকে। যদি সেই নজরে দেখি তাহলে বলিউডের যিনি মহানায়ক অমিতাভ বচ্চন তাঁর স্ট্রাগল কিন্তু কখনও শেষ হয়নি। উনি যা অ্যাচিভ করেছেন ওনাকে এখন তার থেকে বেশি অ্যাচিভ করার লক্ষ্যে এগিয়ে যেতে হয়।”

তিনি আরও বলেন, “স্ট্রাগল সকলকেই করতে হয়। এটা কোনও খারাপ বিষয় নয়। আমার লড়াই ছিল মজাদার-আনন্দময়। পয়সার অভাব ছিল, খাবারের অভাব ছিল, সুবিধা কম ছিল কিন্তু তাতে কোনও অসুবিধা হয়নি। কারণ বন্ধুর ভান্ডার ছিল আমার। রোজ প্রতিদিন আমরা দেখা করতাম। আর্ট-সিনেমা, বিশ্বের অন্যান্য বিষয় নিয়ে গভীর আলোচনা চলত। পকেটে পয়সা নেই। বন্ধুরা সকলে কিছু কিছু মিলিয়ে চালিয়ে নিতাম। সেটা জীবনের ভাইব্রেন্ট টাইম ছিল যা আমাকে তৈরি করেছে।”

‘সত্তা’ সিনেমা: অপরাধ ও কমেডির মিশ্রণ

‘সত্তা’ সিনেমায় তাঁর চরিত্র প্রসঙ্গে শুক্লাজি বলেন, “জীবন কখনও সিঙ্গেল কালারের হতে পারে না। এক মুহূর্তে যেমন আমরা আনন্দ অনুভব করছি পরের মুহূর্তে দুঃখ আসতেই পারে। হিউমার অলওয়েজ রিমেইনস দেয়ার। তাই আপনি যেটাই করুন না কেন সেখানে হিউমার, সিরিয়াসনেস আছে কি না, দেখতে হয়। তাই আমি কখনও ওইভাবে দেখি না যে একজন গ্যাংস্টার হলে তাঁকে সারাক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে কথা বলতে হবে। রাগী হতে হবে। গ্যাংস্টার যদি সারাক্ষণ দাঁত চিবাতে থাকে তাহলে তাঁকে ডেন্টিস্টের কাছে দৌঁড়তে হবে। তাই এক গ্যাংস্টার হাসেও, জীবন উপভোগ করে তার মতো করে। আর সেটাই সত্তা সিনেমায় তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।”

সৌরভ আরও বলেন, “আমার আইডোলজিতে কোনও পজিটিভ বা নেগেটিভ ক্যারেক্টর নেই। ক্যারেক্টার কাহিনীর কারণে নেগেটিভ অ্যাক্ট করতে পারে। ক্যারেক্টার হিউম্যান বিইং হয়। তাই চরিত্রের দিকে নজর দিলে সেখানে হিউম্যানওয়েতে দেখা উচিত। হিউম্যানওয়ে মানেই এই নয় যে তাকে পবিত্রতা বা ভালোবাসার নজরে দেখব। কিন্তু একটা এমপ্যাথি থাকা দরকার যে সে খারাপ কাজ করছে কিন্তু কেন করছে? তবে সেটাকে লব সাইডেড ভিউ বানানোর চেষ্টা করি না।”

অভিনেতার কথায়, “অনেক সময় আমাকে শুনতে হয় কেন আমি গ্যাংস্টারের চরিত্র বেশি করি। কিন্তু গ্যাংস্টারের ক্যারেক্টর কী কথা! গ্যাংস্টার তো ওই চরিত্রের প্রফেশন। সেটা ওর চরিত্র নয়। গ্যাংস্টার অনেক রকমের হতে পারে। পাশাপাশি আমি চিত্রনাট্য অনুসরণ করি। ফলে এই নয় যে আমি অতিরিক্ত কিছু সংযোজন করি।”

কার সঙ্গে কাজ করে বেশি ভালো লেগেছে?

সৌরভ শুক্লা জানান, “তিনি যাঁদের সঙ্গে কাজ করেছেন তাঁদের সকলের সঙ্গে ভালো অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। আসলে কাজটা ভালো হওয়া চাই। যদি তুমি মহান অভিনেতাদের সঙ্গে কাজ করো তাহলে সেই কাজটাই যদি ভালো না হয় তাহলে মজা আসবে না। কি ফ্যাক্টর হল, নতুন কোনও কাজ করার উত্তেজনা, ভালোলাগা থাকা দরকার। সেটা ভালো হলে সব ভালো। তখন সেটা মুখ্য হয় না যে তুমি কার সঙ্গে কাজ করছ।”

সিনেমা-ওটিটি: বিনোদনের ভালো-মন্দ দিক

অভিনেতার কথায়, “সময়ের সঙ্গে বিনোদনের মাধ্যম বদলাবে। একসময় থিয়েটার ছিল জমজমাট। এরপর এল সিনেমা বা হল। লোকে ভাবল থিয়েটার ডুবে যাবে। কোনও অস্তিত্ব থাকবে না। কিন্তু তেমন কিছুই হল না। থিয়েটার আজও বেঁচে আছে। এরপর এল টেলিভিশন। প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আর যাবে না। তেমনও কিন্তু হয়নি। একই ভাবে ওটিটি বিনোদনের একটা মাধ্যম মাত্র। দর্শক যেমন সিনেমা হলে যাচ্ছেন তেমনই ওটিটিতেও সিনেমা দেখছেন। ফলে গেল গেল রব তুলে লাভ নেই। ঠিক যেমন পডকাস্ট এসেছে। সেটাও জনপ্রিয় হচ্ছে।”

বলিউড বনাম দক্ষিণী সিনেমা: বিভাজন দেখেন না অভিনেতা

অভিনেতা এই প্রশ্নে হেসে ফেলেন। তিনি বলেন, “আমি এই ডিভাইডেশন দেখি না। কারণ সংবাদমাধ্যমে সিনেমাকে সাউথ, ইস্ট, নর্থ যেভাগেই ভাগ করা হোক না কেন সিনেমা ইজ সিনেমা। এর থেকে সহজ বিষয় আর কিছু হতে পারে না। আর্থিকভাবে কে কতটা সফল হচ্ছে সেটা আলাদা হিসাব। আমি বক্সঅফিস নম্বরে বিশ্বাস করি। কিন্তু সেটা আমার কনসার্ন হওয়ার বিষয় নয়। যখন সিনেমা নিয়ে কথা হবে, ক্রিয়েটিভিটি নিয়ে কথা হবে সেটাই আসল বিষয়। গুড ফিল্ম ইজ আ গুড ফিল্ম। ব্য়াড ফিল্ম ইজ আ ব্য়াড ফিল্ম। সেটা কোথায় তৈরি হচ্ছে ম্যাটার করে না।”

অবসর সময় কাটে কীভাবে?

সৌরভ শুক্লার কথায়, “অবসর সময় বলে কিছু হয় না। যখন তুমি যে কাজে ব্যস্ত আছ সেটাই তোমার কাজ, সেটাই তোমার ফোকাস। আমি এখনও টেবিল টেনিস খেলি। ফলে ওটাও কিন্তু আমার কাজের মধ্যেই পড়ে। তখন ওটাই আমার প্যাশন। তখন আমি অন্য আর কোনও বিষয় নিয়ে মাথা ঘামাই না। এইভাবেই আমি আমার লাইফ লিড করি।” অভিনেতা জানান, তিনি আর পাঁচটা সাধারণ মানুষের মতো ঘরে সবরকম কাজই করেন। ড্রাইভ করতে ভালোবাসেন। ঘুরতে পছন্দ করেন। রেস্টুরেন্টে খেতে যেতে পছন্দ করেন। বই পড়তে পছন্দ করেন। নতুন নতুন বন্ধু করতে পছন্দ করেন। অনলাইন-অফলাইন বাজার করতেও পছন্দ করেন অভিনেতা।

একনজরে সৌরভ শুক্লা অভিনীত জনপ্রিয় সিনেমা ও চরিত্রের নাম

ব্যান্ডিট কুইন (১৯৯৪) – কৈলাশ
সত্তা (১৯৯৮) – কাল্লু মামা
অর্জুন পণ্ডিত (১৯৯৯) – জনি
হে রাম (২০০০) – মনোহর লালওয়ানি
মহব্বতে (২০০০) – সঞ্জনার বাবা
নায়ক: দ্য রিয়েল হিরো (২০০১) – পাণ্ডারাং
যুবা (২০০৪) – গোপাল
লগে রহো মুন্নাভাই (২০০৬) – বটুক মহারাজ
স্লামডগ মিলিয়নেয়ার (২০০৮) – হেড কনস্টেবল শ্রীনিবাস
বরফি (২০১২) – সুধাংশু দত্ত
জলি এলএলবি (২০১৩) – জাস্টিস সুন্দরলাল ত্রিপাঠী
পিকে (২০১৪) – তপস্বী মহারাজ
রেইড (২০১৮) – রামেশ্বর সিং
দৃশ্যম ২ (২০২২) – মুরাদ আলি
ওয়েব সিরিজ

ইয়ে কালি কালি আঁখে (২০২২)
পপ কৌন ? (২০২৩)
লেখক-পরিচালক হিসেবে কাজ

ড্রাই ডে, অ্যাসিড ফ্যাক্টরি, মুম্বই এক্সপ্রেস, ক্যালকাটা মেল, সালাম এ ইশ্ক ইত্যাদি।