“বিদায় হয়েছে, ভাল হয়েছে”-দিলীপকে ‘বাবাজীবন’ বলে তীব্র আক্রমণ BJP-র তথাগতর

দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে নিজ দলের অভ্যন্তরেই প্রবল বিরোধিতার মুখে পড়েছেন দিলীপ ঘোষ। এবার তার কঠোর সমালোচনা করেছেন বর্ষীয়ান বিজেপি নেতা তথাগত রায়। তথাগতর স্পষ্ট দাবি, দিলীপ ঘোষকে বিজেপির রাজ্য সভাপতির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোটা ছিল দলের একটি মারাত্মক ভুল সিদ্ধান্ত। তথাগত আরও অভিযোগ করেন যে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর দিলীপ কর্মীদের পাশে না দাঁড়িয়ে কেবল ‘জ্ঞান’ দিতেন। প্রাক্তন রাজ্য সভাপতিকে তিনি বিদ্রূপ করে ‘দিলীপ বাবাজীবন’ নামে উল্লেখ করেন।

ঘটনার সূত্রপাত ঘটেছিল গত বুধবার, যখন দিলীপ ঘোষ তার স্ত্রী রিঙ্কু মজুমদারকে নিয়ে দিঘায় নবনির্মিত জগন্নাথ মন্দিরের উদ্বোধনে উপস্থিত হন। রাজ্যের অন্যান্য বিরোধী দলের নেতাদের অনুপস্থিতিতে একমাত্র তিনিই সেখানে ছিলেন। এর পরপরই বিজেপির অন্দরে তার এই উপস্থিতি নিয়ে বিতর্ক শুরু হয় এবং একাধিক নেতা তাকে নিশানা করেন। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বর্তমান রাজ্য সভাপতি সুকান্ত মজুমদার। সুকান্ত মজুমদার পরিষ্কার জানিয়ে দেন যে, দিলীপ ঘোষের এই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ দলের অনুমোদিত ছিল না। এছাড়া সৌমিত্র খাঁ, অনুপম হাজরা সহ আরও অনেক বিজেপি নেতা দিলীপের সমালোচনায় সরব হন।

বৃহস্পতিবার সকালে তথাগত রায় সোশ্যাল মিডিয়ায় একটি দীর্ঘ পোস্টে দিলীপ ঘোষের তীব্র নিন্দা করেন। তিনি লেখেন যে, পিএইচডি ডিগ্রীর প্রয়োজন না থাকলেও ন্যূনতম শিক্ষা ও দীক্ষা থাকা আবশ্যক, যা ছিল না বলেই দিলীপকে রাজ্য সভাপতির মতো উচ্চ আসনে বসানোটা মারাত্মক ভুল ছিল। তার মতে, এই পদ পেয়ে দিলীপের ‘মাথা ঘুরে গিয়েছিল’ এবং তিনি নিজেকে সর্বেসর্বা ভাবতে শুরু করেছিলেন। তথাগত রায় আরও অভিযোগ করেন যে, হীনমন্যতার কারণেই দিলীপ নির্বাচনী হলফনামায় তার শিক্ষাগত যোগ্যতা নিয়ে মিথ্যা তথ্য দিয়েছিলেন, যা আইনত দণ্ডনীয়। তিনি দিলীপের একটি পুরোনো টিভি সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, যেখানে দিলীপ নাকি বলেছিলেন যে বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীরা দেশকে ‘পেচ্ছাব-পায়খানা ছাড়া কিছু দেয়নি’। তথাগত স্মরণ করিয়ে দেন যে, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপির সাফল্য দেখে সবাই দিলীপের প্রশংসা করলেও, সেই বছরই তিনটি উপনির্বাচনে দল শূন্য পেয়েছিল, যা অনেকে ভুলে গিয়েছিলেন। তার ভাষায়, এই সময় “কামিনীকাঞ্চন-আসক্ত এক শিম্পাঞ্জির মত দেখতে বিজেপি নেতার” সমর্থন পাওয়ায় দিলীপের সুবিধা হয়েছিল এবং তিনি নিজেকে ‘ভাবী মুখ্যমন্ত্রী’ ঘোষণা করে দপ্তরের বন্টন পর্যন্ত করে ফেলেছিলেন। কিন্তু পরাজয়ের পর যখন বিজেপি কর্মীরা প্রহৃত হচ্ছিল, তখন দিলীপ নিজে দশজন রক্ষীর পাহারায় থেকে তাদের উপদেশ দিতেন। তথাগত রায় দিলীপের রাজনৈতিক বিদায়ে সন্তোষ প্রকাশ করে তাকে ‘দিলীপ বাবাজীবন’ আখ্যা দিয়ে তার সুখী ও সমৃদ্ধ বিবাহিত জীবন কামনা করেন, কারণ তার মতে অর্থের অভাব দিলীপের নেই। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন যে দল যেন আর একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।

এদিকে, বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই দিঘায় স্ত্রীকে সাথে নিয়ে প্রাতঃভ্রমণে বেরিয়ে দিলীপ ঘোষ রাজ্য বিজেপির নেতৃত্বকে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেন। তিনি রাজ্য বিজেপির লাগাতার পরাজয় নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। দিলীপ বলেন যে, মন্দির যিনিই নির্মাণ করুন না কেন, ভগবান সবার জন্য। কালীঘাট বা রামমন্দির কে তৈরি করেছে তা সবাই হয়তো ভুলে যাবে, কিন্তু ভগবানকে কেউ ভুলবে না। তিনি দাবি করেন যে পশ্চিমবঙ্গে সবকিছুতেই রাজনীতি ঢুকে পড়েছে। তার দিঘা যাওয়া নিয়ে দলের কিছু লোকের ‘কষ্ট’ পাওয়া এবং তাদের হতাশা দেখে তিনি ‘মজা’ পাচ্ছেন বলে জানান। এমনকি কেউ কেউ আত্মহত্যা করার কথাও ভাবছেন শুনে তিনি কর্মীদের চোখের জল না ফেলতে অনুরোধ করেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে তারা রক্ত-ঘাম দিয়ে দল গড়ে তুলেছেন এবং বিজেপি কর্মীরা কখনও পিছন ফিরে তাকায় না। দিলীপের অভিযোগ, যতদিন দলে সন্দেহ বা বিরোধ ছিল না, দল এগিয়েছিল, কিন্তু যখন থেকে এই ‘অপসংস্কৃতি’ প্রবেশ করেছে, তখন থেকে দল পিছিয়ে যাচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, তিনি দশ বছর ধরে রাজনীতি করছেন এবং তার দিকে আঙুল তোলার মতো হিম্মত কারও নেই। তার দাবি, যাদের তিনি দলে এনে নেতা বানিয়েছেন এবং যারা বিজেপিতে থেকে সুযোগ সুবিধা নিচ্ছেন, তাদেরই বেশি ‘পেটব্যথা’ হচ্ছে এবং তারা তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। তিনি কর্মীদের দলের উপর আস্থা রাখতে এবং চিন্তা না করতে পরামর্শ দেন।