বিশেষ: হঠাৎ পৃথিবীর কেন্দ্র ঘুরছে উল্টো দিকে? এর ফলে কী ঘটতে পারে? জেনেনিন কি বলছে বিজ্ঞানীরা

পৃথিবীর উপরিভাগে কী কী ঘটছে, তা প্রযুক্তি এবং পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আমরা সহজেই জানতে পারি। কিন্তু ভূভাগের গভীরে, পৃথিবীর কেন্দ্র পর্যন্ত যে বিশাল রহস্যময় জগত রয়েছে, তার কতটুকুই বা আজ পর্যন্ত বিজ্ঞানীরা পূর্ণাঙ্গভাবে জানতে পেরেছেন! তবে সম্প্রতি প্রকাশিত এক নতুন বৈজ্ঞানিক তথ্য গোটা বিশ্বকে চমকে দিয়েছে এবং ভূবিজ্ঞানীদের ভাবিয়ে তুলেছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল এখন উপরিভাগ যেদিকে ঘুরছে, ঠিক তার বিপরীত অভিমুখে বা ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে ঘুরছে!
শুধু তাই নয়, গবেষণায় উঠে এসেছে আরও আশ্চর্যজনক তথ্য। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, প্রায় এক দশক আগে, ২০০৯ সালে পৃথিবীর কেন্দ্র তার এক দশকের পুরনো স্বাভাবিক ঘূর্ণন হঠাৎ থমকে গিয়েছিল। তার পরেই মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে এটি সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে ঘোরা শুরু করেছে। এই ঘটনা কি জীবজগতের জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনতে পারে? এমন প্রশ্ন ইতিমধ্যেই উঠেছে নানা মহলে।
নেচার জিয়োসায়েন্স-এর গবেষণা ও আবিষ্কার:
সম্প্রতি বিখ্যাত বিজ্ঞান বিষয়ক আন্তর্জাতিক জার্নাল ‘নেচার জিয়োসায়েন্স’ (Nature Geoscience)-এ প্রকাশিত একটি গবেষণার মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা এই চাঞ্চল্যকর বিষয়টি তুলে ধরেছেন। চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটির গবেষকরা হালে এই বিষয়টি জানতে পেরেছেন। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বিশ্বজুড়ে হওয়া সমস্ত ভূমিকম্পের গতিপ্রকৃতি এবং ভূকম্পীয় তরঙ্গ বিশ্লেষণ করে তাঁরা পৃথিবীর কেন্দ্রের ঘূর্ণনের এই পরিবর্তন সম্পর্কে নিশ্চিত হয়েছেন।
ঘূর্ণন চক্র ও পূর্বাভাস:
গবেষকদের দাবি, পৃথিবীর কেন্দ্রস্থল এখন ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে বা counter-clockwise ঘুরতে শুরু করেছে। তাঁদের গবেষণায় আরও জানা গেছে, মোটামুটি প্রতি ৩৫ বছর অন্তর পৃথিবীর কেন্দ্রভাগ নিজের ঘোরার দিক পরিবর্তন করতে পারে। তবে কখনো কখনো এই চক্র সম্পন্ন হতে ৭০ বছরও সময় লাগতে পারে। বিজ্ঞানীরা জানান, ১৯৭০ সালের গোড়ার দিকে প্রথম বার পৃথিবীর কেন্দ্রের ঘূর্ণনের কথা স্পষ্টভাবে টের পান বিজ্ঞানীরা। তাঁদের অনুমান, এই চক্র মেনে আবার ২০৪০ সালের মাঝামাঝি সময়ে কেন্দ্রস্থল নিজের ঘোরার অভিমুখ বদলাতে পারে।
দিনের দৈর্ঘ্যের সঙ্গে সম্পর্ক এবং পৃথিবীর অক্ষে প্রভাব:
পিকিং ইউনিভার্সিটির গবেষকরা ভূমিকম্পের ডেটা বিশ্লেষণ করে আরও জানিয়েছেন যে, কেন্দ্রের ঘূর্ণনের এই পরিবর্তন সম্ভবত পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্যের পরিবর্তনের সঙ্গে জড়িত। যদিও এই পরিবর্তন অত্যন্ত সামান্য, তবুও এটি গুরুত্বপূর্ণ। এছাড়াও, পৃথিবী নিজের অক্ষে যেভাবে সারা ক্ষণ ঘুরে চলেছে, তার গতির উপরেও কেন্দ্রের এই বিপরীত ঘূর্ণনের প্রভাব পড়তে পারে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন।
জীবজগতের কি কোনো বিপদ? বিজ্ঞানীদের আশ্বাস:
তবে এই আবিষ্কার কি জীবজগতের জন্য কোনো বিপদ ডেকে আনবে? এমন প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই উঠছে। এ বিষয়ে গবেষকরা অবশ্য স্পষ্ট জানিয়েছেন, পৃথিবীর উপরিতলে এই ঘূর্ণনের প্রত্যক্ষ প্রভাব টেরও পাওয়া যাবে না। এর কারণ হলো পৃথিবীর কেন্দ্রের ঘূর্ণন অত্যন্ত ধীর গতিতে সম্পন্ন হয় এবং উপরিতলের বিশাল ভরের তুলনায় এর প্রভাব অত্যন্ত নগণ্য। ফলে এই মুহূর্তে পৃথিবীর উপরিতলের জীবকূলের বা আমাদের কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা তাৎক্ষণিক ভয় নেই বলে আশ্বাস দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। সাধারণ মানুষের আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। তবে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টির উপর নিবিড় নজর রাখবেন এবং গবেষণা চালিয়ে যাবেন, যাতে ভবিষ্যতে এই পরিবর্তনগুলির দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব সম্পর্কে আরও সঠিক ধারণা পাওয়া যায়।
পৃথিবীর কেন্দ্রের এই রহস্যময় আচরণ সম্পর্কে নতুন তথ্য নিঃসন্দেহে বৈজ্ঞানিক মহলে এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে এবং ভূগর্ভের গভীরে ঘটে চলা প্রক্রিয়াগুলি সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানকে আরও সমৃদ্ধ করবে। যদিও আপাতত এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব পৃথিবীর উপরিতলে অনুভূত হবে না, তবুও ভূবিজ্ঞানীরা পৃথিবীর অন্দরমহলের এই পরিবর্তনগুলিকে গুরুত্ব সহকারে পর্যবেক্ষণ করছেন।