পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় ঠিক কীভাবে হামলা চালিয়েছিল জঙ্গিরা? প্রকাশ্যে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় গত ২২শে এপ্রিল যে ভয়াবহ জঙ্গি হামলা ঘটেছিল, তার বীভৎস চিত্র এবার ধীরে ধীরে সামনে আসছে। প্রত্যক্ষদর্শী এবং হামলার শিকার হওয়া ব্যক্তিদের বয়ানের ভিত্তিতে জানা যাচ্ছে, জঙ্গিরা অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় ওই জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রে একটি মৃত্যুফাঁদ তৈরি করেছিল, যেখানে আটকে পড়েছিল নিরীহ পর্যটকরা। এই নৃশংস ঘটনা উপত্যকার নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে।
বৈসরন উপত্যকা পর্যটকদের কাছে ‘মিনি সুইৎজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত একটি অত্যন্ত আকর্ষণীয় স্থান। জানা গেছে, হামলার সময় বৈসরন উপত্যকা থেকে পর্যটকদের পালানোর কার্যত কোনো উপায় ছিল না। কারণ, জঙ্গিরা বৈসরন উপত্যকার দুটি প্রধান পথ – প্রবেশ পথ ও বাহির পথ – দুটোই নিজেদের দখলে নিয়ে আগলে রেখেছিল সশস্ত্র অবস্থায়।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বয়ান এবং তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর অনুযায়ী, ঘটনার দিন দুটি জঙ্গি প্রবেশ পথ দিয়ে বৈসরন উপত্যকায় ঢুকেছিল। অন্য এক জঙ্গি দাঁড়িয়েছিল বাহির পথের গেটে পাহারায়, যাতে কেউ পালাতে না পারে। তদন্তকারী সংস্থা সূত্র আরও জানাচ্ছে, সেদিন আরও এক জঙ্গি বৈসরন উপত্যকা লাগোয়া জঙ্গলে লুকিয়ে ছিল, তবে গুলি চালিয়েছিল মোট তিনজন জঙ্গি।
এই তিনজন হামলাকারীর মধ্যে দু’জন পরে ছিল ভারতীয় সেনার পোশাক, যা পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ছিল এবং বিপদের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছিল। অন্য একজন জঙ্গি পরে ছিল স্থানীয় কাশ্মীরি পোশাক।
হামলার সময় প্রথমে গুলি চালানো হয় বৈসরন উপত্যকার বাহির পথে দাঁড়িয়ে থাকা পর্যটকদের লক্ষ্য করে। গুলির আকস্মিক শব্দে ভেতরে থাকা পর্যটকরা আতঙ্কে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রাণ বাঁচাতে দৌড়াতে শুরু করেন এবং বের হওয়ার জন্য এন্ট্রি গেটের দিকে যান। কিন্তু সেখানেও দু’জন জঙ্গি আগে থেকেই ওত পেতে ছিল। এন্ট্রি গেটের দিকে ছুটে আসা ভীতসন্ত্রস্ত পর্যটকদের উপর অতর্কিতে এবং নির্বিচারে গুলি চালাতে শুরু করে তারা।
জঙ্গিদের পাতা এই পূর্ব পরিকল্পিত মৃত্যু ফাঁদে আটকা পড়ে ২৫ জন নিরীহ পর্যটক এবং একজন স্থানীয় কাশ্মীরি সহ মোট ২৬ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণীয় স্থানে এমন ভয়াবহ জঙ্গি হামলা এবং পালানোর পথ রুদ্ধ করে দেওয়ার ঘটনা কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলেছে এবং দেশের নিরাপত্তা বাহিনীকে নতুন করে কৌশল সাজাতে বাধ্য করেছে।
পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় ২৬ জনের এই মর্মান্তিক মৃত্যুতে ক্ষোভে ফুঁসছে গোটা দেশ। জঙ্গিদের যোগ্য জবাব দেওয়ার এবং বদলা নেওয়ার রব উঠেছে সর্বত্র। এই ঘটনার পর থেকেই কাশ্মীরে জঙ্গি দমন অভিযান জোরদার করা হয়েছে এবং বেশ কয়েক জন জঙ্গির বাড়ি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। এই হামলার পাল্টা হিসেবে ভারত সরকার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে একগুচ্ছ কঠোর পদক্ষেপ করেছে। পাকিস্তানের নাগরিকদের জন্য ভিসা বাতিল করা হয়েছে এবং সিন্ধু জল চুক্তি সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ভারত-পাক সীমান্তেও সংঘর্ষ বিরতি চুক্তি লঙ্ঘনের খবর পাওয়া গিয়েছে এবং বেশ কিছু এলাকায় গোলাগুলি চলছে বলে খবর। বৈসরন উপত্যকায় জঙ্গিদের এই পূর্ব পরিকল্পিত এবং নৃশংস হামলা উপত্যকার নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং সন্ত্রাসবাদের ভয়াবহ রূপকে আবারও সামনে এনেছে।