বাংলার এই জঙ্গলে রয়েছে কাজুর খনি, বাজারে বিকোচ্ছে জলের দরে, জেনেনিন কোথায়?

পূর্ব বর্ধমান জেলার আউশগ্রামের জঙ্গলের মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে প্রচুর কাজুবাদামের গাছ, যা এই এলাকার অর্থনীতিতে এক বিশাল সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়। মরশুমের সময়ে এই গাছগুলি থেকে প্রতিদিন কুড়িয়ে নেওয়া হয় বিপুল পরিমাণ কাঁচা কাজুবাদাম। কিন্তু সঠিক প্রক্রিয়াকরণ এবং স্থানীয় বিপণনের অভাবে এই মূল্যবান সম্পদ তার যোগ্য মর্যাদা পাচ্ছে না। বরং, স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছ থেকে অত্যন্ত কম দামে কিনে নিয়ে যাওয়া সেই কাজু বাইরের বাজারে চড়া দামে বিক্রি হচ্ছে, আর স্থানীয়রা রয়ে যাচ্ছেন বঞ্চিত।
আউশগ্রামের জঙ্গলের মধ্যে এক একর জমিতে প্রায় ১০০টির মতো কাজুবাদামের গাছ রয়েছে। স্থানীয় মহিলারা প্রতিদিন জঙ্গল ঘুরে এই কাঁচা কাজুবাদাম কুড়িয়ে সংগ্রহ করেন। এই পরিশ্রমসাধ্য কাজ করে তারা সংগ্রহ করা কাঁচা কাজু দিঘা থেকে আসা মহাজনদের কাছে প্রতি কেজি মাত্র ১৫ টাকা দরে বিক্রি করেন। সারা দিন খেটে তাদের দৈনিক আয় হয় মাত্র ১০০ টাকার মতো। স্থানীয় বাসিন্দা সঙ্গীতা কর্মকার, অর্চনা কর্মকাররা কষ্টের কথা জানিয়ে বলছেন, “সারা দিন জঙ্গলে ঘুরে কাজু কুড়োতে হয়। তার পরে সেগুলো বিক্রি করি মহাজনদের কাছে। যদি আমাদের আউশগ্রামেই কাজু প্রক্রিয়াকরণের ব্যবস্থা থাকত, তা হলে সংসারে একটু বাড়তি আয় হতো।” তাদের এই কথায় স্পষ্ট, স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াকরণের অভাব কীভাবে তাদের ন্যায্য উপার্জন থেকে বঞ্চিত করছে।
মরশুম শুরু হলে আউশগ্রামে কাজু কেনার জন্য প্রতি বছর আসেন দিঘা ও কাঁথি এলাকার ব্যবসায়ীরা। স্থানীয়ভাবে প্রক্রিয়াকরণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায়, তারা এখান থেকে মোটামুটি ৮-১০ কুইন্টাল পর্যন্ত কাঁচা কাজু সংগ্রহ করে লরিতে করে দিঘায় নিয়ে যান। দিঘায় কাজু প্রক্রিয়াকরণের জন্য বিশেষ মেশিন রয়েছে। সেখানেই আউশগ্রামের উন্নত মানের কাজুকে খাওয়ার উপযুক্ত করে প্রক্রিয়াকরণ করা হয় এবং তারপর বাজারে চড়া দামে বিক্রি করা হয়। দিঘা থেকে কাঁচা কাজুবাদাম নিয়মিত নিতে আসা এক ব্যবসায়ী শেখ আবদুল সাত্তার বলছিলেন, “আমরা বহু বছর ধরেই আউশগ্রামে কাজুবাদাম কিনতে আসি। এখানকার কাজুর মান খুব ভালো। তবে তা প্রক্রিয়াকরণের কোনও সুযোগ নেই, তাই দিঘায় ওই কাঁচা কাজুবাদাম নিয়ে গিয়ে বাকি কাজ করতে হয়।”
কাজুবাদাম প্রক্রিয়াকরণ কীভাবে একটি অঞ্চলের অর্থনীতির ছবি পাল্টে দিতে পারে, তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো পূর্ব মেদিনীপুরের কাঁথি মহকুমা। এক সময়ে ভূমিক্ষয় ঠেকাতে শুরু হওয়া কাজুবাগান এখন ওই অঞ্চলের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভে পরিণত হয়েছে। কাঁথি মহকুমায় অন্তত ৭০০ কাজুবাদাম প্রসেসিং ইউনিট রয়েছে, যেখানে প্রচুর মহিলা যুক্ত রয়েছেন প্রক্রিয়াকরণের কাজে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন।
আউশগ্রামের লালমাটি কাজুবাদাম চাষের জন্য আদর্শ হলেও, কাঁথির মতো এখানে কোনো সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে কাজু প্রক্রিয়াকরণ ইউনিট গড়ে ওঠেনি। আউশগ্রাম বিট অফিসার তাপস মাহাত বলছেন, “আমাদের এখানে আগে টেন্ডারের মাধ্যমে কাজু সংগ্রহ হতো। এখন আর তা হয় না। স্থানীয়রা গাছ থেকে কাঁচা কাজুবাদাম কুড়িয়ে বিক্রি করেন। প্রসেসিং ইউনিট গড়ার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।”
স্থানীয়দের জোরালো দাবি, এই এলাকায় একটি কাজুবাদাম হাব গড়ে উঠুক। এতে গ্রামীণ মহিলাদের হাতে যেমন আসবে বিকল্প আয় এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ, তেমনই এই এলাকার গ্রামীণ অর্থনীতি এক স্বনির্ভর কাঠামো তৈরি করতে পারবে। বনজ সম্পদের উপযুক্ত ব্যবহারে এক উজ্জ্বল উদাহরণ তৈরি করার সম্ভাবনা রয়েছে আউশগ্রামের। অথচ সেই বিপুল কাজুবাদাম সম্পদ বর্তমানে স্থানীয় প্রক্রিয়াকরণের অভাবে জঙ্গলমুখী সংগ্রহ এবং দালালনির্ভর অত্যন্ত কম দামের বিক্রির ফাঁদে বন্দি হয়ে পড়ে আছে। এই বিপুল সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।