“আমি দেখেছি ৪ থেকে ৫ জন সন্ত্রাসবাদী..?” ‘আল্লাহ হু আকবর’ বলা সেই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে NIA

গত ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওতে ভয়াবহ জঙ্গি হামলার তদন্তে একটি নতুন এবং গুরুত্বপূর্ণ মোড় এসেছে। জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ) এবার বৈসরনে হামলার সময় উপস্থিত থাকা এক জিপলাইন অপারেটরকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। আজ তক-কে দেওয়া হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ঋষি ভাটের একটি বিস্ফোরক বিবৃতির পর তদন্তকারী সংস্থা এই পদক্ষেপ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

সংবাদ মাধ্যম আজ তকের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পহেলগাঁও হামলার প্রত্যক্ষদর্শী ঋষি ভাট জানান, ঘটনার সময় তিনি জিপলাইনে ছিলেন এবং মজা করে ভিডিও বানাচ্ছিলেন। হঠাৎ বেলা আড়াইটে নাগাদ গুলির শব্দ শুনতে পান। ঋষি বলেন, “আমি দেখেছি ৪ থেকে ৫ জন সন্ত্রাসবাদী ধর্ম জিজ্ঞাসা করে পর্যটকদের গুলি করছে।”

ঋষি ভাটের মূল অভিযোগ ওই জিপলাইন অপারেটরের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, “আমি যখন জিপলাইনে ছিলাম, তখন জিপলাইন অপারেটর প্রথমে স্বাভাবিক আচরণ করছিল। তবে, নীচে গুলির শব্দ শোনার সঙ্গে সঙ্গে সে তিনবার ‘আল্লাহ হু আকবর’ বলে আমার প্যায়ার খোলিয়ে (জি্পলাইন থেকে ছেড়ে দেয়)।” এরপরই ঋষি দ্রুত জিপলাইন বেয়ে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পৌঁছে যান, যেখানে তাঁর স্ত্রী ও সন্তান নীচে অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁর ধারণ করা ভিডিওতে নীচে একের পর এক মানুষকে গুলি করে হত্যা করার মর্মান্তিক দৃশ্য দেখা যায়।

অপারেটরের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন

ঋষি ভাটের এই ভিডিও এবং বয়ান সামনে আসার পর জিপলাইন অপারেটরের ভূমিকা নিয়ে অনেক গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। তিনি কি হামলার বিষয়ে আগে থেকেই কিছু জানতেন বা সন্ত্রাসীদের সঙ্গে তার যোগসাজশ ছিল? জেনে বুঝেই কি তিনি ‘আল্লাহ হু আকবর’ বলে ঋষিকে দ্রুত বিপদগ্রস্ত এলাকা থেকে সরিয়ে দিয়েছিলেন? নাকি গুলির আওয়াজ শুনে তিনিও হতচকিত হয়ে ঘটনাটি বোঝার চেষ্টা করছিলেন এবং আতঙ্কে এমনটা করেছিলেন? অপারেটরের উদ্দেশ্য কী ছিল এবং ঘটনার সময় তার প্রকৃত মানসিক অবস্থা কেমন ছিল, তা এখন তদন্তকারীদের নজরে। এনআইএ এবং জম্মু ও কাশ্মীর পুলিশ এখন ঋষি ভাটের বিবৃতির ভিত্তিতে ওই জিপলাইন অপারেটরকে আবারও বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করবে।

পহেলগাঁও হামলার পরবর্তী প্রভাব ও ভারত-পাকিস্তানের পরিস্থিতি

পহেলগাঁও হামলার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। ভারতের পক্ষ থেকে দ্রুত উচ্চ পর্যায়ের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। প্রতিরক্ষামন্ত্রী রাজনাথ সিং সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদীর কাছ থেকে সামরিক প্রস্তুতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেন এবং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠক করেন। ভারত ফ্রান্সের কাছ থেকে রাফালে সামুদ্রিক বিমানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষর করেছে এবং নৌবাহিনী আরব সাগরে আইএনএস বিক্রান্ত মোতায়েন করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করেছে।

একই সময়ে, এই হামলার প্রতিক্রিয়ার আশঙ্কায় পাকিস্তানেও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনির অভ্যন্তরীণভাবে সমালোচিত হচ্ছেন। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ভারতের সঙ্গে যুদ্ধ এড়াতে পরামর্শ দিয়েছেন। তুরস্কও পাকিস্তানে অস্ত্র পাঠানোর দাবি অস্বীকার করেছে। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লঞ্চ প্যাড থেকে সন্ত্রাসীদের সরিয়ে সেনাবাহিনীর আশ্রয়কেন্দ্রে লুকিয়ে রাখার গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

সিন্ধু জল চুক্তি নিয়ে পাকিস্তানের উদ্বেগ

পহেলগাঁও হামলার পর ভারতের একটি পদক্ষেপ পাকিস্তানের উদ্বেগ আরও বাড়িয়েছে – সিন্ধু জল চুক্তি সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ১৯৬০ সালের সিন্ধু জল চুক্তির অধীনে, পাকিস্তান পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলির (সিন্ধু, ঝিলাম এবং চেনাব) নিয়ন্ত্রণ পায়, যেখানে ভারত পূর্বাঞ্চলীয় নদীগুলির (রাবি, বিয়াস, শতদ্রু) উপর অধিকার রাখে। ভারত এখন পশ্চিমাঞ্চলীয় নদীগুলিতে বাঁধ এবং প্রকল্পের মাধ্যমে জলপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যা পাকিস্তানের তীব্র জল সংকট এবং খরার হুমকির কারণ হতে পারে। পাকিস্তান সিন্ধু এবং তার পশ্চিম উপনদীগুলির উপর জল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত নির্ভরশীল, তাই ভারতের এই অবস্থান তাদের জন্য বড় চিন্তার কারণ।

সব মিলিয়ে, পহেলগাঁও হামলা শুধু জম্মু ও কাশ্মীরের নিরাপত্তা পরিস্থিতিই নয়, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনাও নতুন করে বাড়িয়ে তুলেছে। জিপলাইন অপারেটরকে জিজ্ঞাসাবাদ এই হামলার তদন্তে নতুন তথ্য আনতে পারে, যা হামলার পিছনের ষড়যন্ত্র উন্মোচনে সহায়ক হবে বলে মনে করা হচ্ছে।