বিশেষ: ৮১ মিনিটে বিশ্বের ইতিহাসে দুর্ধর্ষ এক চুরি, ৩৪ বছর পরও এখনো রহস্য অধরা

ভোর রাত। বোস্টনের রাস্তাগুলো তখনো গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। শহরের প্রাণকেন্দ্রে দাঁড়িয়ে থাকা ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়ামটি যেন নিঃশব্দ এক ঘুমের দেশে ডুবে ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালের ১৮ মার্চ সেই ঘুম ভাঙতে চলেছে চিরতরে, এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের মধ্যে দিয়ে। সেদিন রাতে পুলিশ সেজে আসা দুই ঠান্ডা মাথার চোর মাত্র ৮১ মিনিটে জাদুঘর থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল ১৩টি অমূল্য শিল্পকর্ম, যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার। এটি ইতিহাসের বৃহত্তম আর্ট হেইস্টগুলির মধ্যে অন্যতম এবং এর রহস্য আজও অধরা।
সেন্ট প্যাট্রিক’স ডে’র উৎসবের রং তখনো শহরের বাতাসে লেগে ছিল। ঠিক রাত ১টা ২৪ মিনিটে দুইজন ব্যক্তি এসে দাঁড়াল মিউজিয়ামের পেছনের দরজায়। তাদের পরনে ছিল আসল পুলিশের ইউনিফর্ম, হাতে ছিল ওয়াকিটকি। তারা নক করতেই ভেতরের কর্তব্যরত নিরাপত্তাকর্মী ইন্টারকমে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘কী চান?’ পুলিশের পোশাক পরা লোকেরা বললো, ‘কাছেই একটি গোলযোগের খবর পেয়েছি। চেক করতে ভেতরে আসতে দিন।’ পুলিশের পোশাক দেখে এবং তাদের দাবিতে কোনো রকম দ্বিধা না করে দরজা খুলে দিয়েছিলেন গার্ডনারের সেই সময়ের নিরাপত্তাকর্মী।
পুলিশের পোশাক পরা দুজন ব্যক্তি মিউজিয়ামে ঢুকেই নিরাপত্তাকর্মীকে অবাক করে দিয়ে বললো, ‘আপনাদের গ্রেফতার করা হচ্ছে।’ তখনই তাদের আসল পরিচয় প্রকাশ পায় – তারা পুলিশ নয়, তারা ছিল অত্যন্ত ধুরন্ধর এবং ঠান্ডা মাথার চোর, যারা এসেছিল ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লেখাতে। তারা দুজন নিরাপত্তাকর্মীর হাতকড়া পরিয়ে বেসমেন্টের আলাদা দুটি জায়গায় বেঁধে রেখে শুরু করল তাদের লুঠেরাদের অপারেশন। তাদের হাতে সময় ছিল অত্যন্ত কম – মাত্র ৮১ মিনিটের মধ্যে তাদের কাজটি সম্পন্ন করতে হয়েছিল। এই সীমিত সময়ের মধ্যেই তারা জাদুঘর থেকে চুরি করে নিল ১৩টি অমূল্য শিল্পকর্ম, যার মোট মূল্য প্রায় ৫০ কোটি মার্কিন ডলার।
চুরি হওয়া চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে ছিল জোহানেস ভারমিয়ারের বিখ্যাত ‘দ্য কনসার্ট’ (The Concert), রেমব্রান্টের একমাত্র সমুদ্র দৃশ্যের চিত্র ‘দ্য স্ট্রম অন দ্য সি অব গ্যালিলি’ (The Storm on the Sea of Galilee), এদগার দেগার (Degas)-এর আঁকা পাঁচটি স্কেচ ছাড়াও ফ্লিগার উইলিয়াম ফোভেটি (Govaert Flinck) ও এডুয়ার্ড ম্যানের (Édouard Manet) মতো শিল্পীদের আরও অনেক মূল্যবান চিত্রকর্ম ও বস্তু।
শিল্প বিশেষজ্ঞদের মতে, চোরেরা হয়তো শিল্পকর্ম সম্পর্কে খুব একটা ওয়াকিবহাল ছিল না অথবা তারা কোনো নির্দিষ্ট নির্দেশনা নিয়ে এসেছিল। কারণ, তারা অনেক গুরুত্বপূর্ণ চিত্রকর্ম কেটে নিয়ে যায় শুধু ফ্রেম থেকে, অথচ পাশেই ঝুলছিল আরও অনেক বেশি দামি এবং সহজে সরানো যায় এমন চিত্র, যেগুলো তারা ছুঁয়েও দেখেনি। এই বিষয়টিই চোরদের পরিচয় এবং উদ্দেশ্য নিয়ে আজও রহস্য তৈরি করে।
পরদিন সকালে যখন ভোরের আলো ফোটে এবং মিউজিয়ামের কর্মীরা আসেন, তখন গার্ডনার মিউজিয়ামের করিডোরে এক নিঃশব্দ আর্তনাদ ছড়িয়ে পড়ে। দেয়ালে ঝুলে আছে শুধু খালি ফ্রেমগুলো, যেন নিখোঁজ আত্মার প্রতীক। এফবিআই (FBI) শুরু করে বিশাল এবং বিস্তৃত অনুসন্ধান। বোস্টনের আন্ডারওয়ার্ল্ডে ব্যাপকভাবে তল্লাশি চালানো হয় এবং কুখ্যাত গ্যাংস্টার জেমস হোয়াইটি বালজার (James ‘Whitey’ Bulger)-কে সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়। সেসময় অনেকেই বলেন, এই চুরি ছিল একটি ‘আর্নেস্ট হেইস্ট’ (Earnest Heist) – অর্থাৎ যেন কেউ জাদুঘর থেকে শুধুমাত্র নিজের সবচেয়ে প্রিয় এবং পছন্দের জিনিসগুলো তুলে নিয়ে গেছে।
কিন্তু এই রহস্য আজও অধরা। সেই ভয়াবহ রাতের ৩৪ বছর পেরিয়ে গেছে। চুরি হওয়া শিল্পকর্মগুলো আর ফিরে আসেনি। মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ হারানো শিল্পকর্ম উদ্ধারের জন্য ১ কোটি মার্কিন ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে। তবুও সেই দেয়ালে ঝুলে থাকা ফাঁকা ফ্রেমগুলো শিল্পপ্রেমীদের চোখে আজো জল আনে।
এই চুরির মাধ্যমে শুধু রং আর ক্যানভাস হারায়নি। হারিয়েছে ইতিহাস, সেই সব শিল্পকর্মের পেছনের অনুভব, শিল্পীর ভালোবাসা এবং বহু মানুষের স্মৃতি। আর আমরা… আমরা শুধু অপেক্ষায় থাকি, হয়তো কোনো একদিন পৃথিবীর কোনো এক কোণে সেই নিখোঁজ চিত্রকর্মগুলো আবার খুঁজে পাওয়া যাবে। আর তখন গার্ডনার মিউজিয়ামের দেয়ালে ফিরবে রঙের গান এবং শিল্পকলার উদযাপন।
সূত্র: ইসাবেলা স্টুয়ার্ট গার্ডনার মিউজিয়াম, এফবিআই আর্ট ক্রাইম টিম, টাইম ম্যাগাজিন।