“বেড়া ডিঙিয়ে, গর্তে লুকিয়ে…”-জঙ্গিদের ফাঁকি কিভাবে বেঁচে ফিরলেন? জানালেন পর্যটক

জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগামের বৈসরন উপত্যকায় (আরু ভ্যালি) গত ২২ এপ্রিল পর্যটকদের উপর হওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার প্রত্যক্ষদর্শী মাইসোরের সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার প্রসন্ন কুমার ভাট। চোখের সামনে হত্যালীলা শুরু হয়ে যাওয়ার পরও শুধুমাত্র প্রাক্তন সেনাকর্তা ভাইয়ের অসামান্য উপস্থিত বুদ্ধির জোরে তিনি, তাঁর পরিবার এবং আরও বেশ কয়েকজন সেদিন জঙ্গিদের চোখে ধুলো দিয়ে প্রাণে বাঁচতে সক্ষম হয়েছেন। সেই দিনের রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার কথা সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ বিস্তারিতভাবে লিখেছেন প্রসন্ন কুমার ভাট।

প্রসন্ন লিখেছেন যে, খারাপ আবহাওয়ার কারণে দুদিন ভ্রমণ স্থগিত রাখার পর ২২ এপ্রিল দুপুর নাগাদ তিনি পরিবার সহ বৈসরনে যান। সঙ্গে ছিল তাঁর বাচ্চারা, স্ত্রী, ভাই এবং ভ্রাতৃবধূ। তখন ঘড়িতে প্রায় দুপুর ২.২৫ মিনিট। বৈসরনের স্বর্গীয় সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে বাচ্চার দল পিকনিকের মেজাজে খেলাধুলা করছিল। প্রসন্নও বাকিদের মতোই মনোরম পরিবেশের ছবি তুলে সারাজীবনের জন্য কিছু মুহূর্ত ক্যামেরাবন্দি করছিলেন।

আচমকাই ভেসে আসে বেশ কয়েকটি গুলির শব্দ। গুলির শব্দ শুনেই প্রসন্নর ভাই, যিনি একজন প্রাক্তন সেনাকর্মী, বুঝতে পারেন যে এটা অত্যাধুনিক AK47 রাইফেলের আওয়াজ। পরিস্থিতি বুঝে তিনি এক মুহূর্ত দেরি না করে বাচ্চাদের টেনে নিয়ে দৌড়ে কাছের একটি ভ্রাম্যমান শৌচাগারের (portable toilet) পাশে লুকিয়ে পড়েন। সেখানে লুকানোর পর থেকেই তারা দেখতে পান মাঠের মধ্যে একে একে মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ছে। প্রসন্নর ভাই তখন নিশ্চিত হন যে এটি একটি পরিকল্পিত জঙ্গি হামলা।

পরিস্থিতি আঁচ করে প্রসন্নর ভাই শুধু তাঁদের পরিবারকেই নয়, আশপাশে থাকা আরও প্রায় ৩৫-৪০ জন পর্যটককে তৎক্ষণাৎ নির্দেশ দেন উল্টো দিকে, অর্থাৎ জঙ্গিদের থেকে দূরে, দ্রুত দৌড়াতে। ভাইয়ের দেখানো পথেই সবাই দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়াতে শুরু করেন। তাঁর নির্দেশ মতোই, তারা একটি বেড়ার নীচের ছোট গর্ত দিয়ে গলে বেরিয়ে নীচের ঢালে নেমে গিয়েছিলেন, যাতে জঙ্গিদের সরাসরি নজরের আড়ালে চলে যাওয়া যায়। প্রসন্ন কুমার ভাট জানিয়েছেন, সেই পরিস্থিতিতে সেখানে দৌড়ানো আসলে প্রায় প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ানোরই সামিল ছিল।

জঙ্গিদের গুলি প্রায় আধ ঘণ্টা ধরে লাগাতার চলেছিল বলে জানিয়েছেন প্রসন্ন কুমার ভাট। তাঁরা বহুক্ষণ ওই ঢালের আড়ালে লুকিয়ে ছিলেন। দীর্ঘক্ষণ সেখানে থাকার পরে একটি হেলিকপ্টারের শব্দ পেয়ে তাঁরা আবার ওই জায়গায় ফিরে আসেন। কিন্তু সেখানে ফিরে আসার পর যে দৃশ্য তাঁরা দেখেছেন, মাইসোরের এই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সেটিকে তাঁর ‘লাইফটাইম ট্রমা’ (সারাজীবনের জন্য মানসিক আঘাত) বলে বর্ণনা করেছেন। চোখের সামনে প্রায় ২৬ জন ভ্রমণপ্রেমীকে নিথর লাশ হয়ে যেতে দেখা তাঁর পক্ষে এক ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা ছিল।

প্রসন্ন কুমার ভাটের এই হাড়হিম করা বর্ণনা পহেলগাম হামলার ভয়াবহতা এবং প্রাক্তন সেনাকর্তা ভাইয়ের তাৎক্ষণিক বুদ্ধিমত্তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরেছে, যা অনেকগুলো প্রাণ বাঁচাতে সহায়ক হয়েছিল। এই ঘটনা আবারও উপত্যকার নিরাপত্তার চ্যালেঞ্জকে সামনে এনেছে।