OMG! ৬ মাস রেডিও শো চালাল AI, কিছুই টেরই পেল না রেডিওর শ্রোতারা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির ক্ষমতা এবার প্রমাণিত হলো এক অভিনব উপায়ে। অস্ট্রেলিয়ার একটি রেডিও স্টেশন টানা ছয় মাস ধরে এআই দিয়ে তৈরি একজন উপস্থাপক ব্যবহার করে অনুষ্ঠান চালিয়েছে, অথচ তাদের হাজার হাজার শ্রোতাদের মধ্যে কেউই বিষয়টি টের পায়নি। এই ঘটনা প্রযুক্তি জগতে যেমন আলোড়ন সৃষ্টি করেছে, তেমনই স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্কও উস্কে দিয়েছে।

সিডনিভিত্তিক রেডিও স্টেশন সিএডিএ (CADA) থেকে সম্প্রচার হওয়া ‘ওয়ার্কডেজ উইথ থাই’ (Workdays with Tai) নামের অনুষ্ঠানটি এই ঘটনার কেন্দ্রবিন্দুতে। এই অনুষ্ঠানে প্রতি সপ্তাহে সোমবার থেকে শুক্রবার, প্রতিদিন চার ঘণ্টা ধরে হিপহপ, আরঅ্যান্ডবি ও পপসংগীতের সংমিশ্রণ পরিবেশন করা হতো। অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন ‘থাই’ নামের একজন ভার্চুয়াল সত্তা।

অস্ট্রেলিয়ার ফিন্যান্সিয়াল রিভিউ ও সিডনি মর্নিং হেরাল্ডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানটির উপস্থাপক ‘থাই’-এর কণ্ঠ ও অবয়ব তৈরি করা হয়েছিল সিএডিএর মূল প্রতিষ্ঠান এআরএন মিডিয়ার অর্থ বিভাগে কর্মরত একজন প্রকৃত কর্মীর আদলে। এআই ভয়েস তৈরির জন্য ইলেভেনল্যাবস (ElevenLabs) নামের একটি সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে।

আশ্চর্যজনকভাবে, এই অনুষ্ঠান কিংবা স্টেশনের কোথাও সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি যে, ‘থাই’ আদৌ একজন মানুষ নন, বরং একটি এআই সত্তা। বরং অনুষ্ঠানের বিবরণীতে রহস্যময় ভাবে বলা হয়েছিল, ‘আমাদের মিউজিক বিশেষজ্ঞদের বাছাই করা গানগুলো শুনুন থাইয়ের সঙ্গে…’। ফিন্যান্সিয়াল রিভিউর তথ্যমতে, ‘ওয়ার্কডেজ উইথ থাই’ অনুষ্ঠানটি অন্তত ৭২ হাজার শ্রোতার কাছে পৌঁছেছে।

তবে এই এআই উপস্থাপক নিয়ে প্রথম সন্দেহ প্রকাশ করেন সিডনিভিত্তিক লেখক স্টেফানি কুম্বস। এক ব্লগপোস্টে তিনি ‘থাই’-এর পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং উল্লেখ করেন যে এই অনুষ্ঠানের উপস্থাপক সম্পর্কে কোথাও কোনো তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি। এরপর একটি অডিও বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন পর্বে থাই একই ভাবে, একই উচ্চারণে কিছু নির্দিষ্ট শব্দ বলছেন, যা স্পষ্ট ভাবে ইঙ্গিত দেয় যে কণ্ঠটি কৃত্রিম।

বিষয়টি সামনে আসার পর এআরএনের প্রজেক্ট লিডার ফায়েদ তোহমে স্বীকার করেন, ‘থাই’ আসলে এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি। এই স্বীকারোক্তির পর বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়। অস্ট্রেলিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ভয়েস অ্যাক্টরসের ভাইস প্রেসিডেন্ট তেরেসা লিম এর তীব্র সমালোচনা করে বলেছেন, ‘অস্ট্রেলিয়ার শ্রোতারা স্বচ্ছতা ও সত্য জানার অধিকার রাখেন। তাঁদের এমন একজন উপস্থাপকের প্রতি বিশ্বাস তৈরি হয়েছে, যা আদতে একজন কৃত্রিম সত্তা।’

এআরএন মিডিয়ার প্রধান নির্বাহী কিয়ারান ডেভিস বিষয়টি নিয়ে মন্তব্য করেছেন, ‘আমরা বোঝার চেষ্টা করছি—আসল আর নকলের সীমারেখা কোথায়। তবে এটা নিশ্চিত, আমাদের রেডিও উপস্থাপকদের যে শক্তি, তা আমরা এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারছি।’

বিশ্বজুড়েই এখন এআই-ভিত্তিক উপস্থাপক নিয়ে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের ওরেগন অঙ্গরাজ্যের একটি স্টেশন ও স্যাটেলাইট রেডিও প্ল্যাটফর্ম সিরিয়াস এক্সএম (SiriusXM) ইতিমধ্যে এআই উপস্থাপক নিয়ে কাজ শুরু করেছে। তবে এসব নিয়ে বিতর্কও কম নেই। গত বছর পোল্যান্ডের একটি রেডিও স্টেশন তাদের সাংবাদিকদের বাদ দিয়ে এআই উপস্থাপক ব্যবহার করলে স্টেশনটি ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত সেই ‘পরীক্ষামূলক’ প্রকল্প বাতিল করতে বাধ্য হয়।

সিএডিএ-র এই ঘটনা একদিকে যেমন এআই প্রযুক্তির দ্রুত উন্নতি এবং বাস্তব জীবনে তার প্রয়োগের ক্ষমতা দেখিয়েছে, তেমনই অন্যদিকে এটি সংবাদমাধ্যম ও বিনোদনে স্বচ্ছতা, বিশ্বাস এবং মানুষের ভূমিকার মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলো পুনরায় সামনে এনেছে। প্রযুক্তি ও নীতির মধ্যে এই ভারসাম্য কিভাবে বজায় থাকবে, তা নিয়ে বিতর্ক আগামী দিনে আরও বাড়বে বলেই মনে করা হচ্ছে।

তথ্যসূত্র: দ্য ভার্জ ও ইনডিপেন্ডেন্ট ইউকে