বিশেষ: হাজার হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিকের বাহক হতে পারে চিউয়িং গাম, সতর্ক করলো গবেষকরা

আপনি কি নিয়মিত চিউয়িং গাম চিবান? তবে আপনার অজান্তেই আপনার মুখে প্রবেশ করতে পারে হাজার হাজার ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক। সম্প্রতি ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, লস অ্যাঞ্জেলেস (ইউসিএলএ)-এর এক গবেষণায় এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে।

ইউসিএলএ স্যামুয়েলি স্কুল অফ ইঞ্জিনিয়ারিং-এর গবেষকরা তাদের নতুন গবেষণায় দেখিয়েছেন যে, আমরা সাধারণত যে চিউয়িং গাম চিবাই, তা প্রাকৃতিক বা সিন্থেটিক যে উপাদান দিয়েই তৈরি হোক না কেন, চিবানোর সময় তা থেকে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হয়। এই কণাগুলি এতটাই ছোট যে খালি চোখে এদের দেখা যায় না, কিন্তু তা সহজেই মানুষের শরীরে প্রবেশ করতে পারে।

মাইক্রোপ্লাস্টিক হলো প্লাস্টিকের অত্যন্ত ক্ষুদ্র কণা, যা বালির দানার চেয়েও আকারে ছোট। পানির বোতল থেকে শুরু করে খাবারের প্যাকেজিং পর্যন্ত অনেক কিছুতেই এদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। বিজ্ঞানভিত্তিক সাইট নোরিজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, এসব কণা বড় আকারের প্লাস্টিকের জিনিসপত্র ভেঙে তৈরি হয়, অথবা কিছু প্রসাধনী পণ্যে সরাসরি আণুবীক্ষণিক আকারে তৈরি করা হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পরিবেশে মাইক্রোপ্লাস্টিকের পরিমাণ বৃদ্ধি এবং মানব স্বাস্থ্যের উপর এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে বিজ্ঞানীরা উদ্বিগ্ন।

চিউয়িং গাম মানুষের প্লাস্টিকের সংস্পর্শের আরেকটি অপ্রত্যাশিত উৎস হতে পারে কিনা, সেই প্রশ্ন থেকেই ইউসিএলএ-র অধ্যাপক সঞ্জয় মোহান্তি ও স্নাতক শিক্ষার্থী লিসা লো এই গবেষণাটি করেন। তারা ১০টি জনপ্রিয় গাম ব্র্যান্ড নিয়ে পরীক্ষা করেছেন। এর মধ্যে অর্ধেক ব্র্যান্ড কৃত্রিম উপাদান, যেমন পেট্রোলিয়ামভিত্তিক পলিমার ব্যবহার করেছে, এবং বাকি অর্ধেক প্রাকৃতিক উপাদান, যেমন চিকল (একটি উদ্ভিদনির্ভর রস), ব্যবহার করেছে।

গবেষণার অংশ হিসেবে একজন স্বেচ্ছাসেবককে প্রতিটি গামের সাতটি টুকরা চার মিনিটের জন্য চিবাতে দেওয়া হয়েছিল এবং প্রতি ৩০ সেকেন্ডে তার লালার নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তী পরীক্ষাগুলিতে তারা ২০ মিনিটেরও বেশি সময় ধরে মুখে মাইক্রোপ্লাস্টিক নির্গত হওয়ার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করেন।

গবেষকদের মতে, তাদের এ গবেষণার ফলাফল ছিল বিস্ময়কর। দেখা গেছে, কৃত্রিম ও প্রাকৃতিক উভয় ধরনের গাম থেকেই প্রায় একই মাত্রার মাইক্রোপ্লাস্টিক বের হয়েছে। গবেষণায় পাওয়া গেছে, প্রতি গ্রাম চিউয়িং গাম চিবানোর ফলে প্রায় একশটি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা নির্গত হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট ধরনের গামের ক্ষেত্রে এই সংখ্যা প্রতি গ্রামে প্রায় ছয়শটি পর্যন্ত হতে পারে। যেহেতু একটি সাধারণ চিউয়িং গামের টুকরার ওজন ২ থেকে ৬ গ্রামের মধ্যে হয়, তাই একটি টুকরা চিবালে প্রায় তিন হাজারেরও বেশি কণা তৈরি হতে পারে। গবেষকদের হিসাব অনুযায়ী, কেউ যদি বছরে প্রায় ১৬০ থেকে ১৮০ টুকরা চিউয়িং গাম চিবিয়ে থাকেন, তাহলে তিনি নিজের অজান্তেই প্রায় ৩০ হাজার মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা গিলে ফেলছেন।

তবে এখনই এই সংখ্যা নিয়ে আতঙ্কিত না হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। অধ্যাপক মোহান্তি বলেছেন, “মানুষকে ভয় দেখানো আমাদের লক্ষ্য নয়। মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের জন্য ক্ষতিকর কি না, তা আমরা এখনও নিশ্চিত করে জানি না। এ নিয়ে মানুষের ওপর কোনো পরীক্ষা হয়নি।” যদিও প্রাণী এবং মানুষের কোষের উপর করা কিছু গবেষণা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে যে, মাইক্রোপ্লাস্টিক দেহে প্রদাহ বা বিভিন্ন অঙ্গের ক্ষতির মতো সমস্যা তৈরি করতে পারে, তবে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য আরও ব্যাপক গবেষণার প্রয়োজন।

গবেষকরা স্পষ্ট করে বলেছেন যে, এই কণাগুলি হয়তো কম ক্ষতিকর মনে হতে পারে, কিন্তু চিউয়িং গাম যে মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশের আরও একটি উপায়, তা এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট। এটি পরিবেশ এবং মানব স্বাস্থ্যের জন্য মাইক্রোপ্লাস্টিকের প্রভাব নিয়ে গবেষণার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।