বিয়ের ছয় দিনের মাথায় ভিসা জটিলতায় গন্তব্য বদলই কাল হল বিনয়ের ! নতুন জীবন শুরুর ‘স্বপ্ন’ শেষ ভূস্বর্গে

মধুচন্দ্রিমার গন্তব্য বদল না হলে হয়তো এমন মর্মান্তিক পরিণতি হত না। সুইজারল্যান্ডে যাওয়ার কথা ছিল, কিন্তু ভিসা জটিলতার কারণে শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলে জম্মু ও কাশ্মীরের পহেলগাঁওকে বেছে নিয়েছিলেন তাঁরা। আর সেখানেই ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় প্রাণ হারালেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর নববিবাহিত লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়াল। বিয়ের মাত্র ছয় দিনের মাথায়, নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন নিয়েই তাঁর সফর শেষ হয়ে গেল ভূস্বর্গে।
লেফটেন্যান্ট বিনয় নারওয়াল ও তাঁর স্ত্রী হিমাংশীর বিয়ে হয়েছিল মাত্র ছয় দিন আগে। মধুচন্দ্রিমার জন্য তাঁদের প্রথম পছন্দ ছিল ইউরোপের সুইজারল্যান্ড, কিন্তু ভিসা পেতে সমস্যা হওয়ায় তাঁরা কাশ্মীরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পহেলগাঁওয়ের ‘মিনি সুইজারল্যান্ড’ নামে পরিচিত বৈসরান উপত্যকার মনোরম পরিবেশে মঙ্গলবার সকালে যখন তাঁরা প্রাতরাশ সারছিলেন, তখনই অতর্কিতে হানা দেয় একদল সন্ত্রাসী।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া একটি হৃদয়বিদারক ভিডিওতে লেফটেন্যান্ট বিনয়ের স্ত্রী হিমাংশীকে কাঁদতে কাঁদতে স্থানীয়দের বলতে শোনা যাচ্ছে ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ। তিনি বলেন, “আমি ভেলপুরি খাচ্ছিলাম, উনি (আমার স্বামী) আমার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একজন লোক (জঙ্গি) এসে জিজ্ঞেস করল, ও মুসলিম কি না। তারপরই গুলি চালাল।” জানা গেছে, জঙ্গিরা খুব কাছ থেকে গুলি করে লেফটেন্যান্ট বিনয়কে হত্যা করে।
এই ভয়াবহ ঘটনার পর হিমাংশী মানসিকভাবে সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। তবে সেনা সূত্রে জানা গেছে, তিনি বর্তমানে নিরাপদে রয়েছেন। বিনয়ের এই অকাল প্রয়াণে তাঁর পরিবারে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তাঁর দাদু হাওয়া সিং আক্ষেপ করে বলেন, “সুইজারল্যান্ড যাওয়ার ছুটি পেতে কোনও সমস্যা ছিল না। শুধু ভিসা না পাওয়ার জন্যই ওরা কাশ্মীরে গিয়েছিল। ভিসা পেলে হয়তো আজ আমার নাতি বেঁচে থাকত।” বিনয়ের আর এক আত্মীয় রঘুবীর সিং ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, “আমরা চাই পাকিস্তান এমন শিক্ষা পাক যে ভবিষ্যতে সন্ত্রাস পাঠানোর কথা ভাবতেও না পারে। এদের সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেওয়া উচিত। তবেই আমাদের ছেলের আত্মা শান্তি পাবে।”
লেফটেন্যান্ট বিনয়ের শহিদ হওয়ার খবরে শোক প্রকাশ করেছে ভারতীয় নৌবাহিনীও। নৌসেনার মুখপাত্র এক্সে পোস্ট করে অ্যাডমিরাল দীনেশ কে. ত্রিপাঠী এবং সমগ্র নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে গভীর সমবেদনা জানানো হয়েছে। হরিয়ানার মুখ্যমন্ত্রী নায়েব সিং সাইনিও বিনয়ের পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে শোক জ্ঞাপন করেছেন। হামলার খবর পাওয়া মাত্রই বিনয়ের বাবা, বোন এবং শ্বশুরবাড়ির অন্যান্য সদস্যরা দ্রুত পহেলগাঁও পৌঁছান। গোটা গ্রামেও এখন শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে সন্ত্রাসবাদ কেবল প্রাণই কেড়ে নেয় না, অকালে ঝরিয়ে দেয় অনেক স্বপ্নকেও। যেখানে মাত্র এক সপ্তাহ আগে তাঁরা জীবনের বাকি পথ একসাথে চলার অঙ্গীকার করেছিলেন, সেখানে সাত দিনের মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল। সুইজারল্যান্ডের শান্ত পাহাড়ের কোলে নতুন জীবন শুরুর স্বপ্ন অসমাপ্ত রেখে কাশ্মীরের উপত্যকায় এক তরুণ সেনা অফিসারের জীবন এবং তাঁর নবীন প্রেম কাহিনী চিরতরে নীরব হয়ে গেল।