রেকর্ড গড়ার পর কমল সোনার দাম, ১ লক্ষের নিচে ২৪ এপ্রিল! সোনার দামের ওঠানামার কারণ?

রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছনোর পর অবশেষে কিছুটা নেমে এল সোনার দাম। বৃহস্পতিবার, অর্থাৎ ২৪ এপ্রিল ২০২৫ তারিখে ভারতে সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১ লক্ষ টাকার নিচেই লেনদেন হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মূল্য হ্রাসের অন্যতম কারণ হল মুনাফা তোলা (profit booking)।

এদিন মুম্বাইয়ের বাজারে ২৪ ক্যারেট সোনার প্রতি ১০ গ্রামের দাম দাঁড়িয়েছে ৯৮,৩৪০ টাকা, যেখানে গহনা তৈরির জন্য বহুল ব্যবহৃত ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল প্রতি ১০ গ্রামে ৯০,১৪০ টাকা। শুধু সোনাই নয়, রুপার দামও এদিন কিছুটা কমেছে, যদিও তা এখনও প্রতি কেজিতে ১ লক্ষ টাকার উপরেই লেনদেন হচ্ছে।

গত কয়েক মাস ধরে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, বিশেষ করে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য মন্দার আশঙ্কার কারণে সোনার দাম ক্রমশ বাড়ছিল। গত মঙ্গলবারই সোনার দাম প্রতি ১০ গ্রামে ১ লক্ষ টাকার গণ্ডি অতিক্রম করে একটি নতুন রেকর্ড গড়েছিল।

বিশুদ্ধতার দিক থেকে ২৪ ক্যারেট সোনা প্রিমিয়াম ক্রেতাদের পছন্দের তালিকায় থাকে, আর ২২ ক্যারেট সোনা গহনা প্রস্তুতকারক ও বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রিয়, কারণ এটি একদিকে যেমন টেকসই তেমনই এর আকর্ষণ চিরন্তন। বাজার বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমানে সোনার দামে একটি সংশোধন (correction) দেখা যাচ্ছে, যা মূলত বড় বিনিয়োগকারীদের মুনাফা তোলার ফল। তবে তাঁদের দীর্ঘমেয়াদী পূর্বাভাস অনুযায়ী, সোনার বাজার ইতিবাচক থাকবে এবং এই ধরনের দরপতন ক্রেতাদের জন্য সোনার গয়না বা বন্ড কেনার একটি সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করবে।

ভারতের প্রধান শহরগুলিতে ২৪ এপ্রিলের সোনার দর (প্রতি ১০ গ্রাম)

দিল্লি: ২২ ক্যারেট – ৯০,২৯০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৪৯০ টাকা
জয়পুর: ২২ ক্যারেট – ৯০,২৯০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৪৯০ টাকা
আহমেদাবাদ: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৯০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৯০ টাকা
পাটনা: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৯০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৯০ টাকা
মুম্বাই: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৪০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৪০ টাকা
হায়দ্রাবাদ: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৪০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৪০ টাকা
চেন্নাই: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৪০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৪০ টাকা
বেঙ্গালুরু: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৪০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৪০ টাকা
কলকাতা: ২২ ক্যারেট – ৯০,১৪০ টাকা, ২৪ ক্যারেট – ৯৮,৩৪০ টাকা
ভারতে রুপার দাম (২৪ এপ্রিল, ২০২৫)

মুম্বাইয়ে এদিন প্রতি কেজি রুপার দাম ১০০ টাকা কমেছে। গুডরিটার্নস.ইন এর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রতি কেজি রুপা ১,০০,৯০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা এখনও ১ লক্ষের উপরেই রয়েছে।

সোনার দামের ওঠানামার কারণ

ভারতে সোনার দাম মূলত আন্তর্জাতিক বাজারদর, আমদানি শুল্ক, বিভিন্ন কর (যেমন জিএসটি), এবং ভারতীয় টাকার বিনিময় হারের উপর নির্ভর করে। এই সবগুলি কারণ একত্রিত হয়ে প্রতিদিনের সোনার দাম নির্ধারণ করে। এছাড়াও, স্থানীয় চাহিদা, পরিবহন খরচ এবং গহনা তৈরির মজুরি বা মেকিং চার্জ শহরভেদে দামে পার্থক্য তৈরি করে। বিশ্ববাজারে ইরান-ইজরায়েল সংঘাতের মতো ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং মার্কিন অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মতো বিষয়গুলিও সোনার দাম বৃদ্ধিকে প্রভাবিত করেছে।

ভারতীয় সংস্কৃতি ও অর্থনীতিতে সোনা শুধু একটি বিনিয়োগের মাধ্যম নয়, এর এক গভীর তাৎপর্য রয়েছে। বিবাহ এবং বিভিন্ন উৎসব-অনুষ্ঠানে সোনা অপরিহার্য। সোনাকে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে একটি নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে গণ্য করা হয় এবং শেয়ার বাজারের অস্থিরতার বিপরীতে এটি স্থিতিশীলতা দেয়, যা বিনিয়োগকারীদের কাছে এটিকে আকর্ষণীয় করে তোলে।

বিনিয়োগকারীদের জন্য পরামর্শ

সোনার বাজারে যেহেতু এই মুহূর্তে বেশ অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে, তাই বিনিয়োগকারী এবং ব্যবসায়ীদের জন্য উচিত দামের ওঠানামার দিকে সতর্ক নজর রাখা। বিশ্লেষকদের মতে, এই মুহূর্তে দামের যে সংশোধন হচ্ছে তা ক্রেতাদের জন্য একটি ভালো সুযোগ হতে পারে। তবে যেকোনো দীর্ঘমেয়াদী বিনিয়োগের আগে বাজারের প্রবণতা এবং বিশ্ব অর্থনীতির পরিস্থিতি ভালোভাবে বিবেচনা করা জরুরি। সোনা কেনার সময় অবশ্যই হলমার্কযুক্ত সোনা বেছে নিন এবং বিশুদ্ধতার শংসাপত্র নিতে ভুলবেন না। মেকিং চার্জ এবং জিএসটি-এর মতো অতিরিক্ত খরচ সম্পর্কেও সচেতন থাকুন।

গহনা, সোনার বার, মুদ্রা ছাড়াও গোল্ড ইটিএফ (Exchange Traded Fund) এবং সার্বভৌম গোল্ড বন্ডের (Sovereign Gold Bond) মতো বিভিন্ন রূপে সোনা বিনিয়োগ করা যায়। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (RBI) কর্তৃক জারি করা সার্বভৌম গোল্ড বন্ডে বছরে ২.৫% হারে সুদ পাওয়া যায় এবং এটি শারীরিক সোনা রক্ষণাবেক্ষণের ঝামেলা ছাড়াই বিনিয়োগের একটি লাভজনক বিকল্প।

সোশ্যাল মিডিয়ায় (যেমন এক্স) সোনার রেকর্ড দাম নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। অনেকেই এটিকে মুদ্রাস্ফীতির বিরুদ্ধে সুরক্ষা হিসেবে দেখছেন, আবার উচ্চ দামের কারণে অনেকে এখনই সোনা কিনবেন কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় আছেন।

২৪ এপ্রিল ভারতে সোনার দাম ১ লক্ষ টাকার নিচে নেমে এলেও, এটি এখনও বিনিয়োগকারী এবং গহনা ক্রেতাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি এবং স্থানীয় কারণগুলির প্রভাবে দামের ওঠানামা চলতে থাকবে। সঠিক তথ্য এবং পরিকল্পনা সহকারে সোনা কেনা এই পরিস্থিতিতে অত্যন্ত জরুরি। সোনার সাংস্কৃতিক মূল্য এবং এর বিনিয়োগ আকর্ষণ ভারতীয় সমাজে এর চাহিদা ধরে রাখবে। বর্তমান বাজার পরিস্থিতিকে সঠিক তথ্যের ভিত্তিতে কাজে লাগাতে পারলে তা সোনা ক্রেতাদের জন্য লাভজনক হতে পারে।