“আমার কপালে সিঁদুর দেখল, বিতানকে মেরে দিল”-ভয়ঙ্কর সেই জঙ্গি হামলার ঘটনা জানালেন সোহিনী

কাশ্মীরের পহেলগাঁওয়ের বৈসরন উপত্যকায় মর্মান্তিক জঙ্গি হামলায় নিহত দুই বাঙালি পর্যটকের কফিনবন্দি দেহ বুধবার রাতে কলকাতায় ফিরেছে। দমদম বিমানবন্দরে অবতরণ করে বিমান। সেখানেই উপস্থিত ছিলেন নিহতদের পরিবার পরিজন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা। এই হামলার শিকার হওয়া এক মৃতের স্ত্রীর ভয়ঙ্কর বর্ণনা এবং ‘ধর্মীয় পরিচয় দেখে টার্গেট করার’ দাবি ঘিরে নতুন করে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়েছে।

বুধবার রাত আটটা নাগাদ কলকাতা বিমানবন্দরে এসে পৌঁছয় বৈসরন হামলায় প্রাণ হারানো বিতান অধিকারী এবং সমীর গুহর মরদেহ। দুজনই সপরিবারে কাশ্মীর ঘুরতে গিয়েছিলেন। নিহত অপর বাঙালি পর্যটক মণীশ রঞ্জনের দেহ রাঁচি হয়ে তাঁর পুরুলিয়ার বাড়িতে পৌঁছবে বলে জানা গেছে।

বিমানবন্দর থেকে অ্যাম্বুল্যান্সে করে বিতান অধিকারীর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয় তাঁর পাটুলি বৈষ্ণবঘাটার বাড়িতে। একই ভাবে মৃত সমীর গুহর দেহ তাঁর বেহালার সখের বাজারের বাড়িতে নিয়ে ফেরেন পরিবারের লোকজন।

নেতাজিনগর থানা এলাকার বৈষ্ণবঘাটা লেনের বাসিন্দা বিতান অধিকারী স্ত্রীকে ও তিন বছরের শিশুপুত্রকে নিয়ে কাশ্মীরে বেড়াতে গিয়েছিলেন। মঙ্গলবার জঙ্গি হামলায় তিনি কাঁধে গুলিবিদ্ধ হন। পরে তাঁর অবস্থার অবনতি হলে মৃত্যু হয়। বিতান অধিকারীর স্ত্রী সোহিনী অধিকারী এই মুহূর্তে চরম মানসিক আঘাতের মধ্যে রয়েছেন। তিন বছরের সন্তানকে কোলে আঁকড়ে তিনি ঘটনার ভয়াবহ বিবরণ দিয়েছেন।

সোহিনী অধিকারীর দাবি, জঙ্গিরা তাদের ধর্মীয় পরিচয় দেখেই টার্গেট করেছিল। তিনি বলেন, “কপালে সিঁদুর ছিল আমার, তাতেই মেরে দিল ওকে।” তাঁর চোখের সামনেই স্বামীকে গুলি করে মারা হয় বলে জানান সোহিনী দেবী।

সূত্রের খবর, বিতান অধিকারী এবং তাঁর স্ত্রী সোহিনী দুজনই কর্মসূত্রে ফ্লোরিডায় কর্মরত। ছুটিতে তাঁরা কলকাতায় নিজেদের বাড়িতে ফিরেছিলেন এবং গত ১৮ এপ্রিল কাশ্মীর ভ্রমণে যান। বৃহস্পতিবারই তাঁদের কলকাতায় ফেরার কথা ছিল। ২২ এপ্রিল পহেলগাঁওয়ের বৈসরনের একটি রিসর্টে অবস্থান করছিলেন তাঁরা, সেখানেই ঘটে এই হামলা।

ঘটনার পর বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব বিতান অধিকারীর পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। বিজেপি নেতা শঙ্কুদেব পণ্ডা বিতানের স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা শোনেন। সোহিনী দেবীর বয়ান অনুযায়ী, হামলাকারীরা সেনার পোশাকে এসেছিল এবং পর্যটকদের আলাদা করছিল। জঙ্গিরা বলছিল, যারা মুসলিম তারা সরে যান এবং কালমা বলুন। যাদের কপালে সিঁদুর দেখেছে তাদের টার্গেট করেছে বলে অভিযোগ করেছেন সোহিনী।

রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও ফোন করে বিতানের স্ত্রী সোহিনী অধিকারীর সঙ্গে কথা বলেন এবং সবরকম ভাবে পাশে থাকার আশ্বাস দেন। এরপর রাজ্যের বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীও সোহিনী দেবীর সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। শুভেন্দু অধিকারী পরে জানান, সোহিনীর সঙ্গে প্রায় দশ মিনিট কথা হয়েছে এবং তিনি সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছেন।

শুভেন্দু অধিকারী জানান, সোহিনী তাঁকে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। কীভাবে সেনার পোশাকে দুই সশস্ত্র জঙ্গি এসে মুসলিম এবং অ-মুসলিম পর্যটকদের আলাদা করে। মুসলিমদের ছেড়ে দিয়ে হিন্দু পুরুষ, নারী ও শিশুদের আলাদা করা হয়। এরপর হিন্দু পুরুষদের ‘কলমা’ পাঠ করতে বলা হয়, যা কেউই পারেননি। শুভেন্দু অধিকারীর দাবি, এরপরই জঙ্গিরা গুলি চালানো শুরু করে এবং স্ত্রীর চোখের সামনে বহু হিন্দু পুরুষকে গুলি করে হত্যা করা হয়। তাঁর স্পষ্ট অভিযোগ, শুধু হিন্দু ধর্মাবলম্বী হওয়ার জন্যই এই নির্মম হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছে।

বিমানবন্দরে বিতান অধিকারীর মরদেহ গ্রহণ করার সময় রাজ্যের মন্ত্রী অরূপ বিশ্বাস এবং ফিরহাদ হাকিম উপস্থিত ছিলেন। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী এবং বিজেপি নেত্রী অগ্নিমিত্রা পাল সহ অন্যান্য বিজেপি নেতৃত্বও সেখানে উপস্থিত ছিলেন। শুভেন্দু অধিকারী বিতানের ছোট্ট ছেলেকে কোলে তুলে নেন। শুভেন্দুকে দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন বিতানের স্ত্রী সোহিনী। শুভেন্দু অধিকারীর পক্ষ থেকে বিতান অধিকারীর স্ত্রীকে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে যে সরকার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে।

কাশ্মীরের এই হামলা এবং তার পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক মহলেও আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। একদিকে নিহতদের পরিবারে শোকের মাতম এবং নৃশংসতার অভিযোগ, অন্যদিকে রাজনৈতিক নেতাদের মন্তব্য ঘিরে শুরু হয়েছে চাপানউতোর। এই ঘটনা দেশের নিরাপত্তা এবং পর্যটকদের সুরক্ষা নিয়ে আবারও প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।