“সুপ্রিম নির্দেশ মানছেন কেউ, কেউ করছেন আন্দোলন”-জেলায় জেলায় ভিন্ন ছবি,বিপাকে প্রধান শিক্ষকেরা

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর চাকরি হারানো শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্কুলে ফেরা নিয়ে রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় ভিন্ন ছবি দেখা দিয়েছে। আদালত তাঁদের আগামী ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুমতি দিলেও, সোমবার স্কুল খোলার পর বেশিরভাগ শিক্ষকই স্কুলে যাননি। এর জেরে একদিকে যেমন পঠন-পাঠন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনই বিপাকে পড়েছেন প্রধান শিক্ষকেরা।

সোমবার স্কুল খোলার আগে যোগ্য–অযোগ্যদের তালিকা প্রকাশ করার কথা থাকলেও তা হয়নি। এই কারণে সিংহভাগ শিক্ষক-শিক্ষিকাই স্কুলবিমুখ রইলেন। তাঁদের দাবি, যোগ্য-অযোগ্য তালিকা প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা কাজে যোগ দেবেন না। অনেকেই আবার কলকাতায় গিয়ে এসএসসি ভবন অভিযানে সামিল হন এবং সেখানে অবস্থানে বসেন।

এই পরিস্থিতিতে হতাশ প্রধান শিক্ষকেরা। শিক্ষক সংখ্যা কমে যাওয়ায় কীভাবে স্কুলে পঠন-পাঠন চালাবেন, কীভাবে পরীক্ষার খাতা দেখবেন বা অন্যান্য প্রশাসনিক কাজ সামলাবেন, তা ভেবে কূল পাচ্ছেন না তাঁরা।

এর মধ্যেই অবশ্য চাকরিহারা শিক্ষকদের একটা অংশ সোমবার স্কুলে হাজির ছিলেন এবং ক্লাসও নিয়েছেন। জেলার চিত্র এক্ষেত্রে একে অপরের থেকে অনেকটাই আলাদা।

কোথাও ইতিবাচক সাড়া:

বর্ধমানের বিভিন্ন স্কুলের প্রধান শিক্ষক ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দিয়েছেন। জানা গিয়েছে, জেলার কমবেশি সমস্ত স্কুলেই চাকরিহারা শিক্ষকদের একটা বড় অংশের হাজিরা ছিল। তাঁরা ক্লাসও নিয়েছেন নিয়ম করে। পূর্ব বর্ধমান জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক দেবব্রত রায় বলেন, ‘অনেক প্রধান শিক্ষকই জানিয়েছেন শিক্ষকরা স্কুলে এসেছেন। কাউকে স্কুলে আসতে নিষেধ করা হয়নি।’ তবে এরই মধ্যে বিজ্ঞানের এক শিক্ষিকা অনিমা মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘সহকর্মীরা এসএসসি ভবনের সামনে আন্দোলন করছেন। আর আমাদের অবস্থাটা না মরে বেঁচে থাকার মতো হয়ে আছে। স্কুলে যাচ্ছি, অনেকটা সেই যেতে হবে বলেই।’

কাটোয়া-কালনার চিত্র:

তবে পূর্ব বর্ধমানের কাটোয়া ও কালনা মহকুমায় চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। কাটোয়ার পানুহাট রাজমহিষী স্কুলে বা কাটোয়া কাশিরামদাস বিদ্যায়তনে চাকরি বাতিলের তালিকায় থাকা একজন শিক্ষকও এ দিন হাজির ছিলেন না, জানালেন প্রধান শিক্ষক অমলকান্তি দাস। কাটোয়া রামকৃষ্ণ বিদ্যাপীঠে এ দিন একজন মাত্র হাজির হয়েছিলেন বলে জানান প্রধান শিক্ষক সুবীর মণ্ডল। কালনা মায়াসুন্দরী হাই স্কুলের অঙ্কের শিক্ষক চন্দন ঘোষ চাকরিহারাদের তালিকায় আছেন। সোমবার তিনি বলেন, ‘আজ স্কুলে যাইনি। যোগ্য–অযোগ্যদের তালিকা বের হওয়ার পর তা দেখে সিদ্ধান্ত নেব স্কুলে যাব কি না।’

দুর্গাপুরের জেমুয়া ভাদুবালা বিদ্যালয়ে চাকরি হারানো শিক্ষকরা ক্লাসে এসেছেন ও হাজিরার খাতায় সই করেছেন। স্কুলের প্রধান শিক্ষক জইনূল হক বলেন, ‘আমাদের স্কুলে দু’জন শিক্ষকের চাকরি চলে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁরা নিয়মিত স্কুলে এসে ক্লাস করাচ্ছেন। আগে সই করছিলেন না। ১৭ এপ্রিল আদালতের নির্দেশের পর তাঁরা হাজিরার খাতায় সই করছেন। নিয়মিত ক্লাস নিচ্ছেন।’ দুর্গাপুর স্টেশন সংলগ্ন রাইরানি গালর্স স্কুলের তিন জন শিক্ষিকা চাকরি হারিয়েছেন এবং আদালতের নির্দেশের পর তাঁরা ফের স্কুলে আসছেন। আসানসোলের মহিলা কল্যাণ স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পাপড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, তাঁর স্কুলে চাকরিহারা দু’জন শিক্ষিকা স্কুলে আসছেন। রানিগঞ্জের একটি স্কুলে ১২ জনের চাকরি গিয়েছে। প্রধান শিক্ষিকা শ্রুতি গঙ্গোপাধ্যায় জানিয়েছেন, শনিবার একজন স্কুলে এসেছিলেন, সোমবার কেউ আসেননি। তবে বারাবনির দোমোহনি কেলেজোড়া হাই স্কুলের কোনও চাকরিহারা শিক্ষক স্কুলে আসছেন না বলে জানিয়েছেন প্রধান শিক্ষক মৃণালজ্যোতি গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি জানান, জেলা স্কুল পরিদর্শকের লিখিত নির্দেশ না পাওয়ায় স্যালারি পোর্টালে তথ্য জমা করতে পারছেন না, ফলে বেতন পেতে সমস্যা দেখা দিতে পারে।

পুরুলিয়া ও বাঁকুড়ার চিত্র:

পুরুলিয়ায় হাতে গোনা দু’একটি স্কুল বাদে অন্য স্কুলগুলিতে হাজিরা দেননি কোনও চাকরিহারা শিক্ষক। মানবাজারের স্বপন সুব্রত হাই স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নীলোত্পল দত্ত বলেন, ‘তিন জন শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। তাঁরা কেউ এ দিন স্কুলে যোগ দেননি।’ বাঁকুড়ায়ও চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকাদের অধিকাংশই স্কুলে যাননি সোমবার। এ দিন তাঁদের মধ্যে অনেকেই কলকাতায় গিয়ে এসএসসি ভবন অভিযানে সামিল হন এবং অবস্থানে বসেন। এসএসসি ভবনের সামনে অবস্থানে সামিল হওয়া বাঁকুড়ার ওন্দার পাত্রহাটি রামরতন হাই স্কুলের বাংলার শিক্ষিকা শর্মিষ্ঠা দুয়ারি বলেন, ‘এসএসসি নানা ভাবে আমাদের আন্দোলনকে ভাঙার চেষ্টা করছে। আমাদের দাবি, কারা যোগ্য কারা অযোগ্য তার তালিকা প্রকাশ করতে হবে। যতক্ষণ না পর্যন্ত তা প্রকাশ করা হচ্ছে এসএসসি ভবনের সামনেই আমাদের অবস্থান বিক্ষোভ চলবে।’

বরাবাজারের বদলডি হাই স্কুলের চাকরিহারা শিক্ষক মলয় মুখোপাধ্যায় বলেন, ‘যোগ্য শিক্ষক–শিক্ষিকাদের পাশাপাশি যোগ্য শিক্ষাকর্মীদের জন্যও যেন এসএসসি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করে তাঁদের স্কুলে ফেরানোর ব্যবস্থা নেয়। কারণ, স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষক–শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীরা একে অপরের পরিপূরক।’ শাঁকড়া হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক অভিষেক মিশ্র বলেন, ‘আমাদের স্কুলের তিন জন শিক্ষক এই রায়ের আওতায় পড়েছেন। তাঁদের মধ্যে একজন শিক্ষক আজ স্কুলে এসেছিলেন।’

সব মিলিয়ে, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পরও পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। চাকরিহারা শিক্ষকদের মধ্যে স্কুলে ফেরা এবং আন্দোলনের মধ্যে বেছে নেওয়ার ক্ষেত্রে ভিন্ন মত দেখা যাচ্ছে। এর ফলে রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থা এক চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে চলেছে। স্থায়ী সমাধান না হওয়া পর্যন্ত এই পরিস্থিতি বজায় থাকবে বলেই মনে করা হচ্ছে।