পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যুর পর নতুন পোপ নির্বাচন করা হবে যেভাবে, জেনেনিন সেই পদ্ধতি

রোমান ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস ৮৮ বছর বয়সে মারা গেছেন। দীর্ঘদিন ধরেই তিনি বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। ভ্যাটিকানের পক্ষ থেকে এক বিবৃতিতে তাঁর মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার কোনো দেশ থেকে আসা প্রথম পোপ হিসেবে তিনি ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ভ্যাটিকান জানিয়েছে, সোমবার (২১ এপ্রিল) স্থানীয় সময় সকাল ৭ টা ৩৫ মিনিটে ভ্যাটিকানের কাসা সান্তা মার্টায় নিজ বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তাঁর মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে প্রায় ১৪০ কোটি ক্যাথলিক অনুসারীর মধ্যে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
পোপ ফ্রান্সিস হিসেবে পরিচিত হলেও তাঁর আসল নাম ছিল জর্জ মারিও বার্গোগ্লিও। ১৯৩৬ সালের ১৭ ডিসেম্বর আর্জেন্টিনার বুয়েনস আয়ার্সে তাঁর জন্ম। ২০০১ সালে কার্ডিনাল হওয়ার পর ২০১৩ সালের মার্চে, পোপ ষোড়শ বেনেডিক্টের এক বিরল পদত্যাগের পর, তিনি ক্যাথলিক চার্চের নেতৃত্বের জন্য নির্বাচিত হন। ৭৪১ খ্রিস্টাব্দে সিরিয়ায় জন্ম নেওয়া তৃতীয় গ্রেগরির মৃত্যুর পর তিনিই ছিলেন রোমের প্রথম অ-ইউরোপিয় বিশপ। সেন্ট পিটারের সিংহাসনে বসা প্রথম জেসুইটও ছিলেন তিনি। প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি রোমান ক্যাথলিক চার্চের আধ্যাত্মিক নেতা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ক্যাথলিক চার্চের পোপ হওয়ার পর তিনি অনেক কিছুই প্রথমবার করলেও সংস্কার কার্যক্রম কখনও বন্ধ করেননি। পুরনোকে আঁকড়ে ধরা ঐহিত্যবাদীদের মাঝেও তিনি তাঁর সংস্কারপন্থী মনোভাব সত্ত্বেও সমানভাবে জনপ্রিয় ছিলেন।
পোপের মৃত্যুর পর এখন নতুন করে পোপ নির্বাচনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে কয়েকশ’ বছরের পুরনো রীতি অনুসরণ করে ক্যাথলিক খ্রিস্টানদের প্রধান ধর্মগুরু নির্বাচন করা হবে।
পোপের শেষকৃত্য ও সমাধিস্থ করার প্রক্রিয়া:
মৃত্যুর পর বেশকিছু নিয়ম-নীতি মেনে পোপেরও শেষকৃত্য সম্পন্ন হয়। ঐতিহ্যগতভাবে পোপের শেষকৃত্যের প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল। তবে মারা যাওয়ার বেশ কিছুদিন আগে পোপ ফ্রান্সিস তাঁর শেষকৃত্যের প্রক্রিয়াটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত করার পরিকল্পনায় অনুমোদন দিয়ে গেছেন, যা পূর্বসূরিদের থেকে ভিন্ন।
- কফিন: এর আগে যত পোপ মারা গেছেন, তাঁদের সাধারণত সাইপ্রেস কাঠ, ওক কাঠ এবং সীসা দিয়ে তৈরি কফিনে সমাহিত করা হতো। পোপ ফ্রান্সিস সেখানে দস্তা দিয়ে আবৃত একটি সাধারণ কাঠের কফিন বেছে নিয়েছেন।
- মরদেহ রাখা: ঐতিহ্য অনুযায়ী সমাহিত করার আগে সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা জানানোর জন্য পোপের দেহ এতদিন সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় একটি উঁচু প্ল্যাটফর্ম, যা ক্যাটাফাল্ক নামে পরিচিত, সেখানে রাখা হতো। সেই ঐতিহ্য ভেঙে পোপ ফ্রান্সিস নিজের মরদেহ কফিনের ভেতরে রেখে ঢাকনা খুলে রাখতে বলে গেছেন, যাতে শোকাহত ব্যক্তিরা সহজে শ্রদ্ধা জানাতে পারেন।
- সমাধিস্থলের স্থান: পোপদেরকে সাধারণত ভ্যাটিকান সিটির সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকায় সমাধিস্থ করা হয়। তবে এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে ফ্রান্সিসই হতে যাচ্ছেন প্রথম কোনো পোপ, যাঁকে ভ্যাটিকানের বাইরে সমাহিত করা হবে। পোপ ফ্রান্সিসের নির্দেশনা অনুযায়ী তাঁকে রোমের অন্যতম প্রধান ব্যাসিলিকা সেন্ট মারি মেজরে সমাহিত করা হবে। ব্যাসিলিকা হলো এমন একটি গির্জা, যেটিকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ স্থান হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে ভ্যাটিকান এবং মেজর ব্যাসিলিকার সঙ্গে পোপের একটি বিশেষ সংযোগ থাকে।
নতুন পোপ নির্বাচন প্রক্রিয়া: কনক্লেভ
ক্যাথলিক চার্চের নতুন পোপ নির্বাচন প্রক্রিয়াটি বেশ জটিল এবং কঠোর গোপনীয়তা ও নির্দিষ্ট নিয়মের অধীনে সম্পন্ন হয়।
- নির্বাচন করেন কারা: ক্যাথলিক চার্চের শীর্ষ ধর্মযাজক, যারা ‘কলেজ অব কার্ডিনালস’ নামে পরিচিত, তারাই ভোট দিয়ে নতুন পোপ নির্বাচন করেন। এসব কার্ডিনালদের সকলেই পুরুষ এবং তারা সরাসরি পোপ কর্তৃক বিশপ হিসেবে নিযুক্ত হন।
- যোগ্য ভোটার: বর্তমানে মোট ২৫২ জন ক্যাথলিক কার্ডিনাল রয়েছেন, যাদের মধ্যে নতুন পোপ নির্বাচনে সরাসরি অংশ নিতে পারবেন কেবল ১৩৫ জন, যাদের বয়স ৮০ বছরের কম। অন্য কার্ডিনালদের বয়স ৮০ বছরের বেশি হওয়ায় তারা সরাসরি নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও নতুন পোপ হিসেবে কাকে নির্বাচিত করা উচিত, সেই বিতর্কে অংশ নিয়ে তারা নিজেদের মতামত জানাতে পারবেন।
- কনক্লেভ: যখন একজন পোপ মারা যান (অথবা পদত্যাগ করেন, যেমনটি ২০১৩ সালে পোপ বেনেডিক্ট ষোড়শের ক্ষেত্রে ঘটেছিল), তখন ভ্যাটিকানে কার্ডিনালদের একটি সম্মেলন ডাকা হয়। এরপর কনক্লেভ অনুষ্ঠিত হয়, যেটি পোপ নির্বাচনের সময় হিসাবে পরিচিত। বর্তমান পোপের মৃত্যুর পর থেকে নতুন পোপ নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়কালে ‘কলেজ অব কার্ডিনালস’ই গির্জার যাবতীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনার দায়িত্ব পালন করে থাকেন।
- ভোটদান: পোপ নির্বাচনের ভোট অনুষ্ঠিত হয় চিত্রশিল্পী মাইকেলেঞ্জেলোর চিত্রাঙ্কন শোভিত বিখ্যাত সিস্টিন চ্যাপেলের ভিতরে। কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে সেখানে কার্ডিনালরা তাদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দেন।
- সময়কাল: নতুন পোপ নির্বাচনের এই প্রক্রিয়ায় বেশ কয়েক দিন সময় লেগে যেতে পারে। অতীতে এক সপ্তাহ, এমনকি এক মাস সময় ধরেও ভোট চলতে দেখা গেছে। ভোট চলাকালে কার্ডিনালদের মধ্যে কেউ কেউ মৃত্যুবরণ করেছেন, এমন নজিরও আছে।
ধোঁয়ার ইঙ্গিত ও নতুন পোপের ঘোষণা:
পোপ নির্বাচন কতটুকু এগোলো, সেটি বোঝার একমাত্র ঐতিহ্যবাহী উপায় হলো সিস্টিন চ্যাপেলের চিমনি থেকে বের হওয়া ধোঁয়া। নির্বাচন চলাকালে প্রতিবার ভোট শেষে ব্যালট পেপার নির্দিষ্ট চুল্লিতে পুড়িয়ে ফেলা হয়। এর ফলে দিনে দু’বার যে ধোঁয়া বের হয়, সেটিই নতুন পোপ নির্বাচনের বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়।
- কালো ধোঁয়া: এর অর্থ হলো পোপ নির্বাচন এখনও সম্পন্ন হয়নি বা কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভোট পাননি।
- সাদা ধোঁয়া: সাদা ধোঁয়া দেখার মানে হলো নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন।
সাদা ধোঁয়া দেখা যাওয়ার পর সাধারণত ঘন্টাখানেকের মধ্যে নতুন পোপ ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরে সেন্ট পিটার্স স্কয়ারের বারান্দায় এসে দাঁড়ান। এরপর কনক্লেভে অংশগ্রহণকারী একজন জ্যেষ্ঠ কার্ডিনাল আনুষ্ঠানিকভাবে নতুন পোপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানান। তিনি ল্যাটিন ভাষায় চিৎকার করে বলেন, “হ্যাবেমাস পাপাম” (Habemus Papam), বাংলায় যার অর্থ দাঁড়ায়, “আমাদের একজন পোপ আছেন।” কার্ডিনাল এরপর নতুন পোপের গৃহীত নাম ঘোষণা করেন। পোপরা সাধারণত নিজেদের আসল নামের পরিবর্তে একটি ল্যাটিন নাম গ্রহণ করেন। পোপ ফ্রান্সিস এক্ষেত্রে বড় উদাহরণ, যাঁর প্রকৃত নাম ছিল জর্জ মারিও বার্গোগলিও।
পোপ হওয়ার যোগ্যতা ও দায়িত্ব:
- যোগ্যতা: তাত্ত্বিকভাবে বললে বলা যায়, বাপ্তিস্ম হওয়া যে কোনো রোমান ক্যাথলিক পুরুষই পোপ হতে পারেন; তবে বাস্তবতা হচ্ছে, ভ্যাটিকানের কার্ডিনালরা তাঁদের নিজেদের মধ্য থেকেই একজনকে পোপ হিসেবে বেছে নিতে পছন্দ করেন। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায় যে, নতুন পোপ নির্বাচনের ক্ষেত্রে কার্ডিনালরা সাধারণত একজন ইউরোপীয়, বিশেষ করে একজন ইতালিয়কেই বেছে নেন (এখন পর্যন্ত নির্বাচিত ২৬৬ জন পোপের মধ্যে ২১৭ জনই এসেছেন ইতালি থেকে)। জর্জ মারিও বার্গোগোলিও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে নির্বাচিত প্রথম পোপ।
- দায়িত্ব: পোপ হলেন ক্যাথলিক খ্রিষ্টানদের প্রধান ধর্মগুরু। রোমান ক্যাথলিকরা বিশ্বাস করেন যে, তিনি যীশু খ্রিস্টের বংশধারার সরাসরি প্রতিনিধিত্ব করেন এবং সেন্ট পিটারের জীবন্ত উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত হন। সেন্ট পিটারকে খ্রিষ্টান ধর্মপ্রচারকদের নেতা মানা হয়। ফলে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে একজন পোপ বিশ্বের সমস্ত ক্যাথলিক গির্জার প্রধান আধ্যাত্মিক নেতা নিযুক্ত হন। গির্জাগুলোর পাশাপাশি সারা বিশ্বের প্রায় একশ’ চল্লিশ কোটি ক্যাথলিক খ্রিষ্টান তাঁর নির্দেশনা মেনে ধর্মীয় রীতি-নীতি পালন করে থাকে এবং পোপের কাছ থেকে ধর্মীয় বিভিন্ন শিক্ষা ও পরামর্শ পেয়ে থাকেন। সারা বিশ্বে খ্রিস্টান ধর্মের যত অনুসারী রয়েছেন, তাদের প্রায় অর্ধেকই রোমান ক্যাথলিক। প্রোটেস্ট্যান্ট, অর্থোডক্স সহ অন্যান্য খ্রিস্টান শাখা পোপের কর্তৃত্বকে স্বীকার করেন না।
- বসবাস ও খরচ: পোপের বসবাস বিশ্বের সবচেয়ে ছোট রাষ্ট্র ভ্যাটিকান সিটিতে, যার চারপাশ ইতালির রাজধানী রোম দিয়ে বেষ্টিত। ধর্মগুরু হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য পোপ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বেতন পান না। তবে তাঁর জীবনযাপন ও ভ্রমণের জন্য প্রয়োজনীয় সকল খরচ ভ্যাটিকান সিটি বহন করে থাকে।
পোপ ফ্রান্সিসের মৃত্যু ক্যাথলিক বিশ্বে এক বিরাট শূন্যতা তৈরি করেছে। তাঁর সংস্কার, নম্রতা এবং দরিদ্রদের প্রতি তাঁর মনোযোগ তাঁকে বিশ্বজুড়ে এক বিশেষ স্থান করে দিয়েছিল। এখন কয়েকশ’ বছরের ঐতিহ্য মেনে নতুন পোপ নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা নির্ধারণ করবে পরবর্তীকালে ক্যাথলিক চার্চের পথচলা কেমন হবে।
(সূত্র : বিবিসি বাংলা)