বিশেষ: বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ দেশ, যেখানে মানুষের কোনোদিন কিছুই হারায়না, জেনেনিন নাম?

বিশ্বের সবচেয়ে নিরাপদ দেশগুলোর তালিকায় প্রথম সারিতেই রয়েছে আইসল্যান্ড। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ, বিজনেস ইনসাইডার এবং গ্লোবাল পিস ইনডেক্স— এই সমস্ত আন্তর্জাতিক সমীক্ষায় আইসল্যান্ডকে প্রায়শই এক নম্বর স্থান দেওয়া হয়। তবে নিরাপত্তা এবং শৃঙ্খলার নিরিখে এশিয়ার এমন একটি দেশ আছে, যা অনেক ক্ষেত্রেই বিশ্বকে নতুন কিছু শিক্ষা দেয়। সেই দেশটিতে আপনার দামি জিনিস, যেমন মোবাইল ফোন বা টাকার থলি, রাস্তায় বা ট্যাক্সিতে ভুল করে ফেলে এলেও সেটি ঠিকই ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা অত্যন্ত বেশি। সেই দেশটি আর অন্য কেউ নয়, সেটি হলো জাপান।
দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশেই একবার যদি মোবাইল ফোন, পার্স বা অন্য কোনো মূল্যবান জিনিস হারিয়ে যায়, তাহলে তা ফিরে পাওয়ার আশা প্রায় কেউই করেন না। লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড ব্যবস্থা থাকলেও তা সাধারণত ততটা কার্যকর বা বিশ্বাসযোগ্য হয় না। কিন্তু জাপান এক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। জাপানের অনেক সিস্টেমই বিস্ময়কর, তার মধ্যে অন্যতম হলো এর অত্যন্ত কার্যকর ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড সিস্টেম’।
এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে? এর মূল একক হলো স্থানীয় ‘কোবান’, যা মূলত এক বা দু’কামরার ছোট্ট পুলিশ স্টেশন। পুরো জাপানে প্রায় ৬ হাজার ৩০০টি এই ধরনের কোবান রয়েছে, যাদের অন্যতম প্রধান কাজই হলো হারানো জিনিস দ্রুত তার মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। যদি জাপানে কেউ কোনো জিনিস খুঁজে পান, তারা মুহূর্ত দেরি না করে সেটি নিকটবর্তী কোবানে নিয়ে আসেন। কোবান কর্তৃপক্ষ তখন জিনিসটির ছবিসহ দ্রুত তাদের লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড ওয়েবসাইটে আপলোড করে দেয়।
যার জিনিস হারিয়েছে, তিনি তিন মাস পর্যন্ত সেই ওয়েবসাইট বা যে কোনো কোবানে গিয়ে নিজের হারানো জিনিসের খোঁজ করতে পারেন। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর প্রায় ১ কোটি ২৬ লক্ষ (১২.৬ মিলিয়ন) জাপানি তাদের কিছু না কিছু জিনিস হারান, আর তার বেশিরভাগই সফলভাবে পুনরুদ্ধার করা হয়। তিন মাসের মধ্যে কেউ দাবি না করলে, নিয়ম অনুযায়ী জিনিসটি যিনি খুঁজে পেয়েছিলেন তাকে দিয়ে দেওয়া হয় বা নগরপালের দফতরে জমা করা হয়। জাপানের অত্যন্ত ব্যস্ত রেলওয়ে স্টেশনগুলিতেও হারানো জিনিস জমা দেওয়া বা নেওয়ার জন্য আলাদা পুলিশ থানার ব্যবস্থা থাকে।
তবে এই পুরো ব্যবস্থার সাফল্যের পেছনে কেবল পরিকাঠামোই নয়, জাপানের মানুষের সার্বিক নৈতিক শিক্ষা এবং সততাও অনেকাংশে দায়ী। জাপানের শিশুরা ছোটবেলা থেকেই শেখে যে, অন্যের জিনিস কুড়িয়ে পেলে তা সঙ্গে সঙ্গে বড়দের কাছে দিতে। সেই শিক্ষা বড় হয়েও তাদের মধ্যে বজায় থাকে। তাই কেউ কিছু কুড়িয়ে পেলেই নিজের কাছে না রেখে থানা বা কোবানে গিয়ে জমা দিয়ে দেন। জাপানের সম্পত্তি আইনও এই ব্যবস্থাকে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু এই মডেল বা সিস্টেম অন্য কোনো দেশে চালু করলেই হয়তো হারানো সমস্যার সমাধান হবে না। কারণ এই ব্যবস্থার মূল ভিত্তিটাই হলো জাপানের মানুষের উচ্চমানের জাতিগত নৈতিক শিক্ষা এবং তাদের মধ্যে থাকা প্রবল শৃঙ্খলতাবোধ। পরিচ্ছন্নতা এবং শৃঙ্খলার মতো বিষয়গুলিতেও জাপান বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত।
তথ্যসূত্র: জাপান লিভিং গাইড