SPORTS: ছক্কায় শুরু, আউট হয়ে কান্না, ১৪ বছর বয়সীর ব্যাটিং শো’য়ে মুগ্ধ ক্রিকেট দুনিয়া

এইডেন মার্করামের ঘূর্ণি বল বুঝতে না পেরে যখন স্টাম্পড হয়ে ডাগআউটের দিকে ফিরছিলেন বৈভব সূর্যবংশী, তখন তার চোখে চিকচিক করছিল অশ্রুজল। ক্যামেরার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি সেই মুহূর্ত এড়ায়নি। হেলমেট খুলে ডান হাতের বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো করে চোখ মুছতে মুছতে সাজঘরের দিকে পা বাড়ালেন ১৪ বছর বয়সী এই তরুণ ভারতীয় ব্যাটার। হঠাৎ দেখলে মনে হবে, বুঝি অল্পের জন্য একটি অসাধারণ শতরান হাতছাড়া হয়েছে। অথচ তার নামের পাশে তখন মাত্র ৩৪ রান। খেলেছেন মোটে ২০টি বল। কিন্তু এই ছোট্ট ইনিংসটি দিয়েই যেন বড়দের ক্রিকেটে নিজের আগমন বার্তা দিলেন, আইপিএলের ইতিহাসে সর্বকনিষ্ঠ ক্রিকেটার হিসেবে অভিষেক হওয়া এই বিস্ময়-বালক।
৩৪ রানের এই ঝলমলে ইনিংসেই বৈভব নিজের প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি লম্বা দৌড়ের ঘোড়া। তবে বৈভবের উজ্জ্বল ব্যাটিং সত্ত্বেও জয়ের ধারায় ফিরতে পারল না রাজস্থান রয়্যালস। জয় হাতের মুঠোয় এসেও লখনৌ সুপার জায়ান্টসের কাছে ২ রানে হেরে গেল তারা।
জয়পুরের স্টেডিয়ামে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নেমে লখনৌ সুপার জায়ান্টস ৫ উইকেট হারিয়ে ১৮০ রানের একটি লড়াকু পুঁজি গড়ে তোলে। দলের হয়ে ৪৫ বলে সর্বোচ্চ ৬৬ রান করেন এইডেন মার্করাম। এছাড়াও, ইনিংসের শেষ দিকে আয়ুশ বাদোনি ৩৪ বলে ৫০ রানের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলেন। তাদের সম্মিলিত প্রয়াসে লখনৌ একটি চ্যালেঞ্জিং স্কোর খাড়া করে, যা শেষ পর্যন্ত লখনৌয়ের বোলারদের কল্যাণে জয়ের জন্য যথেষ্ট প্রমাণিত হয়।
আগের ম্যাচে অপ্রত্যাশিত চোট পাওয়ায় এই ম্যাচে রাজস্থানের নিয়মিত অধিনায়ক সঞ্জু স্যামসন খেলতে পারেননি। ফলে রাজস্থানের ব্যাটিং লাইনআপে একজন ওপেনারের অভাব ছিল। রাহুল দ্রাবিড়ের কোচিং স্টাফ ১৪ বছর ২৩ দিন বয়সী বৈভবের ওপর ভরসা দেখায়। তবে প্রথম ম্যাচে তাকে ফিল্ডিং করতে হয়নি। ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার হিসেবে তিনি কেবল ব্যাটিংয়েই নেমেছিলেন। আর নিজের অভিষেক ম্যাচেই যেভাবে ব্যাট চালালেন, তাতে আগামী ম্যাচগুলোতে তাকে প্রথম একাদশের বাইরে রাখা কঠিন হবে বলেই মনে করছেন ক্রিকেট বিশেষজ্ঞরা।
১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে নিজের অভিষেক ম্যাচের প্রথম বলেই শার্দুল ঠাকুরকে কভারের ওপর দিয়ে বাউন্ডারি হাঁকান বৈভব। পরের ওভারে আবেশ খানের বলে আরও একটি দৃষ্টিনন্দন ছক্কা মারেন। আগেরটি কভারের ওপর দিয়ে গেলে এটি ছিল সোজা বোলারের মাথার ওপর দিয়ে। প্রথম চার বলেই তার দুটি বিশাল ছক্কা যেন ঘোষণা করে দিল, ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন ‘বৈভব’ হয়ে ওঠার সমস্ত গুণ তার মধ্যে বিদ্যমান।
তবে, এদিন ভাগ্য কিছুটা সহায় ছিল বৈভবের। তার একটি ক্যাচ ফিল্ডার তালুবন্দী করতে পারেননি। এছাড়াও দু’বার ক্যাচের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু তার ব্যাট থামেনি। পেসার এবং স্পিনার—সবার বিরুদ্ধেই সাবলীলভাবে বড় শট খেলতে দেখা যায় তাকে। শেষ পর্যন্ত এইডেন মার্করামের একটি ডেলিভারিতে স্তব্ধ হয়ে যায় গ্যালারির উল্লাস। মার্করামের যে বলটিতে বৈভব আউট হন, সেটিও তিনি কভারের ওপর দিয়ে মারতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বল সামান্য ঘুরে যাওয়ায় তার ব্যাটে লাগেনি এবং শরীরের ভারসাম্য রাখতে না পারায় তিনি সময়মতো পা মাটিতে নামাতে পারেননি। ততক্ষণে উইকেটকিপার স্টাম্পিং সম্পন্ন করেন।
২০ বলে ৩৪ রানের ঝড়ো ইনিংসে বৈভব দুটি চার ও তিনটি ছক্কা হাঁকান। যতক্ষণ তিনি ক্রিজে ছিলেন, রাজস্থানের রান তাড়া করা বেশ নির্ভার মনে হচ্ছিল। ৮৫ রানের মাথায় প্রথম উইকেট হারানোর পরেও রাজস্থান জয়ের স্বপ্ন দেখছিল। শেষ ওভারে জয়ের জন্য মাত্র ৯ রান দরকার ছিল, এবং হাতে তখনও ৫টি উইকেট অক্ষত। উইকেটে তখন বিধ্বংসী ব্যাটসম্যান শিমরন হেটমায়ার। টি-টোয়েন্টির বিচারে এই লক্ষ্য অর্জন করা তেমন কঠিন নয়।
তবে এদিন লখনৌয়ের পেসার আবেশ খানের দুরন্ত বোলিংয়ের কোনো জবাব ছিল না রাজস্থানের ব্যাটসম্যানদের কাছে। হেটমায়ারকে ফিরিয়ে এনে প্রায় নিশ্চিত হারা ম্যাচটি ছিনিয়ে নেন আবেশ খান। শেষ ওভারে তিনি মাত্র ৫ রান দেন এবং ৪ ওভার বল করে ৩৭ রান দিয়ে ৩টি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে ম্যাচসেরা হন। বৈভবের অভিষিক্ত ইনিংসটি নিঃসন্দেহে মনে রাখার মতো হলেও, শেষ পর্যন্ত রাজস্থানকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দিতে পারেনি।