অনির্বাণ চক্রবর্তীর নস্টালজিক বর্ষবরণ: মফঃস্বলের সেই মনকেমন করা দিন

আজ বাঙালির নববর্ষ। নতুন বছরকে নতুন করে বরণ করে নেওয়ার দিন। এই পয়লা বৈশাখ শুধু একটি তারিখ নয়, এটি বাঙালির আবেগ, ধর্ম নিরপেক্ষতার প্রতিচ্ছবি এবং সাংস্কৃতিক প্রতিবাদেরও অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম। এই বিশেষ দিনে অভিনেতা অনির্বাণ চক্রবর্তী ডুব দিলেন তাঁর ছোটবেলার মফঃস্বলের বর্ষবরণের স্মৃতিতে। সেই মনকেমন করা দিনগুলির কথা তিনি তুলে ধরলেন অকপটে।

অনির্বাণ বলেন, “আমি তো কলকাতার ছেলে নই। আমার ছোটবেলাটা কেটেছে বজবজে। ছোট্ট মফস্‌সলে। আশির দশক সেটা। ইঁট পাতা রাস্তা, নির্জন প্যাঁচালো পুরনো গলি, সার সার একতলা বাড়ির মাঝে জেগে থাকত দু’একটা দোতলা বাড়ি, বড় বড় পুকুর, মাঠ-গাছ মিলিয়ে সে এক দারুণ জায়গা ছিল। বাইরের পৃথিবীর খবর খুব একটা আসত না। তবে তাতে কিছু খুব একটা যায় আসত না।”

স্মৃতির ঝাঁপি খুলে তিনি আরও বলেন, “সেই ছোটবেলায় বছরে দু’বার নতুন জামাকাপড় পেতাম মা-বাবার কাছ থেকে। এক পুজো আর দুইয়ে এই নববর্ষ। তাই এই দিনটা ঘিরে একটা বাড়তি আগ্রহ তো কাজ করতই। মনে পড়ে, পাঞ্জাবি, পাজামা যেমন পেয়েছি তেমনই কখনও স্রেফ একটা স্যান্ডো গেঞ্জি-ও পেয়েছি। তবে তাতে আনন্দে এতটুকুও ভাটা পড়ত না। বাড়িতে সেদিন সকালবেলা গরম লুচি, ছোলার ডাল বানাত মা। সঙ্গে থাকত গোল করে কাটা গরম বেগুনভাজা। আজও চোখ বুজলে যেন সেই গন্ধ পাই। দুপুরে মাংস হতো। সঙ্গে একটু ভাজা, শেষপাতে চাটনি মিষ্টি-দই। সঙ্গে আরও কিছু টুকটাক। সেটাই তখন বিরাট ভোজ আমার কাছে।”

সন্ধ্যার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনির্বাণ বলেন, “সন্ধ্যেবেলা ঝকঝকে আকাশে একটা দুটো করে তারা ফুটে উঠতেই খানিক সেজেগুজে ফিটফাট হয়ে নিতাম। বাবা-মায়ের হাত ধরে নানান দোকানে যেতাম। হালখাতার নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে। মফস্‌সলের ছোট পাড়া। সবাই প্রায় সবাইকে চিনত। রাস্তায় দেখা হয়ে যেত। সেজেগুজে সবাই বেরিয়েছে। এরপর দোকানে হাজির হতেই গরম সিঙ্গাড়া, চপ, মিষ্টি ভরা প্যাকেট, প্লেট এগিয়ে দেওয়া হতো। সঙ্গে থাকত কোকা কোলা ওঠা গোল্ড স্পটের বোতল। আমার উৎসাহ থাকত কোন দোকান কীরকম ক্যালেন্ডার করেছে। পরে আমাদের বন্ধুদের মধ্যে আলোচনাও হতো। দারুণ বৈচিত্র্য থাকত এমন দাবি করব না, তবু ওই আর কি। ওটাই ছিল মস্ত আনন্দ। ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ হয়তো।”

সেই সময়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কথা বলতে গিয়ে অভিনেতা জানান, “একটা কথা না বললেই নয়। সেই আমাদের পাড়ায় নববর্ষ উদ্‌যাপনে আয়োজিত হতো সাংস্কৃতিক উৎসব। বজবজে লাইব্রেরির একটা প্রেক্ষাগৃহ ছিল। ছোট। সারি সারি কাঠের ফোল্ডিং চেয়ার পাতা থাকত। মঞ্চে রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুলগীতি এসব হতো। রবীন্দ্রনৃত্য তো হতোই। এবং নাটক। আমিও দু’একবার পারফর্ম করেছি। এই সন্ধ্যা একটা বড় আকর্ষণ ছিল আমাদের কাছে। যখন একটু বড় হয়েছি, দেখেছি এই দিনে বন্ধুরা তাদের ভাললাগার মানুষের সঙ্গে বেরিয়েছে, এই সন্ধ্যার অনুষ্ঠানে দল বেঁধে পাশাপাশি হয়তো বসেছে কিংবা আড়চোখে এ-ওর দিকে তাকাচ্ছে, মুখে মুচকি হাসি। কিন্তু আমি এসবের মধ্যে থাকতাম না। ভয় লাগত। মানে ভীতু-ই ছিলাম বলতে গেলে। পাড়ায় প্রেম করব, ওরে বাবা!”

বর্তমান সময়ের বর্ষবরণের অভিজ্ঞতা প্রসঙ্গে অনির্বাণ বলেন, “আজকাল পেশার খাতিরে এদিন নানান অনুষ্ঠান থাকে, নববর্ষের পার্টিতে যেতে হয়, তাতে খুব যে উল্লাসে মেতে উঠলাম, আনন্দ করি, এমনটা কিন্তু নয়। যেতে হয় তাই যাই। ঠিক যেমন এই পেশার খাতিরেই সারা বছর পোশাক কিনতে হয়, কিনি-ও। কিন্তু নতুন পোশাক কেনার আনন্দটা কি আর ছোটবেলার মতো হয়? বিশ্বাস করুন, তেমন একটা হয় না। পয়লা বৈশাখে, পুজোতে ওই একটা নতুন জামা-প্যান্ট পাওয়ার যা আনন্দ ছিল, তা এখন বলে বোঝাতে পারব না। ঠিক যেমন আশির দশকের ওই সহজ-সরল নববর্ষের সন্ধ্যার অনুষ্ঠানগুলোর স্মৃতি আজও স্পষ্ট। ওই আনন্দ-ও আর পাই না।”

সবশেষে অভিনেতা বলেন, “আজ সেইসব দিনের থেকে অনেক দূরে সরে এসেও এসব কথা মন ভাল করা স্মৃতির মতো হয়ে আছে বলেই এত সহজে বলতে পারলাম হয়তো। মাঝে মাঝে মনে হয় এসব সেই হারিয়ে যাওয়া গত জন্মের অনির্বাণের স্মৃতি। মন খারাপ হলেই, এই স্মৃতি-ই হয়ে যায় আমার টাইম মেশিন!”