মেহুল চোকসীকে ফেরাতে বেলজিয়ামকে চিঠি ভারতের, অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে প্রত্যর্পণ এড়াতে মরিয়া হিরে ব্যবসায়ী

ব্যাঙ্ক প্রতারণার মামলায় অভিযুক্ত হিরে ব্যবসায়ী মেহুল চোকসীকে দেশে ফেরাতে জোরদার তৎপরতা শুরু করেছে ভারত সরকার। নয়াদিল্লির পররাষ্ট্র মন্ত্রক ইতিমধ্যেই বেলজিয়াম সরকারকে এ বিষয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে।

অন্যদিকে, মেহুল চোকসীর আইনজীবী বেলজিয়ামের আদালতে একটি আর্জি জানিয়েছেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেছেন যে তাঁর মক্কেল গুরুতর অসুস্থ এবং ক্যান্সার আক্রান্ত। এমনকি হাসপাতাল থেকেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে তাঁকে যেন ভারত সরকারের হাতে তুলে দেওয়া না হয়।

একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার সূত্র জানাচ্ছে, গ্রেফতারের সম্ভাবনা আঁচ করতে পেরে মেহুল চোকসী সুইজারল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। ভারতীয় গোয়েন্দারা এই তথ্য আগেভাগেই বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল। সিবিআই-এর গ্লোবাল অপারেশন ইউনিট তাঁর পরিকল্পনার কথা বেলজিয়াম কর্তৃপক্ষকে অবগত করে।

বেলজিয়ামের আইনি প্রক্রিয়া এবং সরকারি নিয়মকানুন মেনে মেহুল চোকসীকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের হাতে তুলে দেওয়া কবে নাগাদ সম্ভব হবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্কের ১৩ হাজার কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে ধৃত এই গুজরাতি ব্যবসায়ীকে নিজেদের হেফাজতে পেতে ভারত সরকার ১২৫ বছরের পুরনো একটি চুক্তিকে কাজে লাগিয়েছে।

১২৫ বছরের পুরনো প্রত্যর্পণ চুক্তি:

১২৫ বছর আগে, ১৯০১ সালে তৎকালীন ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে বেলজিয়ামের একটি প্রত্যর্পণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। সেই সময় ভারত ব্রিটিশ শাসনের অধীনে ছিল। স্বাধীনতা লাভের পর ভারত ও বেলজিয়াম পারস্পরিক চিঠি আদান-প্রদানের মাধ্যমে সেই চুক্তিটিকে বহাল রাখে।

প্রত্যর্পণ চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য:

দ্বৈত অপরাধমূলকতা (Dual Criminality): প্রত্যর্পণের অন্যতম প্রধান শর্ত হল, যে অপরাধের জন্য অভিযুক্ত ব্যক্তিকে ফেরত চাওয়া হচ্ছে, সেই অপরাধ উভয় দেশেই শাস্তিযোগ্য হতে হবে।
যথেষ্ট প্রমাণ: যে দেশ প্রত্যর্পণ চাইছে, তাদের অপরাধীর বিরুদ্ধে যথেষ্ট এবং জোরালো প্রমাণ পেশ করতে হবে—হয় পূর্বে দণ্ডিত হওয়ার, অথবা বিচারের জন্য পর্যাপ্ত তথ্য।
নাগরিক সুরক্ষা: কোনো দেশই তাদের নিজস্ব নাগরিককে প্রত্যর্পণ করতে বাধ্য নয়।
রাজনৈতিক উদ্দেশ্য: যদি কোনো প্রত্যর্পণ অনুরোধ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বা রাজনৈতিক অপরাধের জন্য হয়ে থাকে, তবে তা প্রত্যাখ্যান করা হতে পারে।
সময়সীমা: প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ার জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার ১৪ দিনের মধ্যে যদি আনুষ্ঠানিক অনুরোধ না করা হয়, তবে তাকে মুক্তি দেওয়া যেতে পারে। একইভাবে, গ্রেফতারের দুই মাসের মধ্যে যদি যথেষ্ট প্রমাণ না দেওয়া না হয়, তবে তাকেও মুক্তি দেওয়া হতে পারে।
পরবর্তী বিচার ও তৃতীয় দেশে প্রেরণ: প্রত্যাবর্তিত ব্যক্তিকে প্রত্যর্পণের পরে নতুন কোনো অপরাধের জন্য বিচার করা যাবে না। এছাড়াও, তাকে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো যাবে না, যদি না তার নিজ দেশের অনুমতি পাওয়া যায়।
মেহুল চোকসির ক্ষেত্রে ভারত ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে বেলজিয়াম থেকে তাঁকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানিয়েছে। যখন সিবিআই-এর গ্লোবাল অপারেশন সেন্টার তাকে অ্যান্টওয়ার্পে শনাক্ত করে। বর্তমানে তিনি গ্রেফতার হওয়ায় ভারতীয় সংস্থাগুলি আনুষ্ঠানিকভাবে বেলজিয়ামকে প্রত্যর্পণের জন্য আবেদন করেছে। মেহুল চোকসির বিরুদ্ধে ভারতীয় দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা রুজু হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র (১২০ বি), প্রমাণ লোপাট (২০১), বিশ্বাসভঙ্গ (৪০৯), প্রতারণা (৪২০), হিসাব জালিয়াতি (৪77এ) এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ধারা ৭ ও ১৩ (ঘুষ নেওয়া ও দুর্নীতিমূলক কার্যকলাপ)।