“মুর্শিদাবাদে হিংসার নেপথ্যে কারা?”-উঠে আসছে SIMI সহ একাধিক জঙ্গি গোষ্ঠীর নাম?

মুর্শিদাবাদের সাম্প্রতিক অশান্তির পিছনে একাধিক উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠনের যোগ থাকতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ। তদন্তকারী সূত্রে এমনটাই খবর পাওয়া গেছে। পাশাপাশি, এই হিংসাত্মক ঘটনায় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (SDPI)-এর কতটা প্রভাব ছিল, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
এসডিপিআই কী?
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (SDPI) হল ভারতের একটি রাজনৈতিক দল। এটি ২০০৯ সালে পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া (PFI)-এর রাজনৈতিক শাখা হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে। দলটি সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণির অধিকারের জন্য কাজ করার দাবি করে। তবে, বিভিন্ন সময়ে এই দলের বিরুদ্ধে উগ্রবাদী কার্যকলাপের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
এর আগে, গত ৯ই এপ্রিল ইন্ডিয়া টুডের এক রিপোর্টে জানা যায়, মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ আইন বিরোধী সমাবেশে বেশ কিছু উস্কানিমূলক বক্তব্য রাখা হয়েছিল। সেই সংক্রান্ত কিছু ভিডিও-ও সংবাদমাধ্যমের হাতে আসে। জঙ্গিপুরের পিডব্লুডি মাঠে ‘ইমাম মোয়াজ্জিন অ্যাসোসিয়েশন’ আয়োজিত ওই সমাবেশে ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অফ ডেমোক্রেটিক রাইটস (APDR)’ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ ইন্ডিয়া (SDPI)-সহ একাধিক সংগঠন সমর্থন জুগিয়েছিল।
বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবকদের উস্কানি
বর্তমানে বেঙ্গল পুলিশের তদন্তকারীরা বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হাতে পেয়েছেন। সেই তথ্যে মুর্শিদাবাদের হিংসায় SDPI-এর জড়িত থাকার ইঙ্গিত মিলছে। পুলিশি তদন্তে উঠে এসেছে যে, SDPI-এর সদস্যরা গত কয়েকদিন ধরে ওয়াকফের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে এলাকার মুসলিম যুবকদের উস্কানি দিচ্ছিল। SDPI-এর সদস্যরা প্রত্যন্ত এলাকায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে যুবক ও কিশোরদের ওয়াকফের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার জন্য প্ররোচিত করছিল।
মুসলিম সম্প্রদায়ের যুবক ও কিশোরদের বলা হয় যে, সরকার ওয়াকফের নামে তাদের সবকিছু কেড়ে নেবে। এর বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য তাদের উৎসাহিত করা হয়। এমন বেশ কিছু উস্কানিমূলক কথা বলা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
মৃত যুবকের পরিবারও একই অভিযোগ করছে
শনিবার মুর্শিদাবাদের একটি হাসপাতালে ইজাজ আহমেদ নামে এক যুবকের মৃত্যু হয়। বিক্ষোভ চলাকালীন তিনি গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মৃত্যুর পর, ইজাজের পরিবারের সদস্যরাও অভিযোগ করেছেন যে, মুর্শিদাবাদে SDPI উস্কানিমূলক প্রচার চালিয়েছে।
সিমি-ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের দোসর, পিএফআই-এর ঘাঁটি
পুলিশের সূত্র অনুযায়ী, একসময় বাংলায় নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন স্টুডেন্টস ইসলামিক মুভমেন্ট অফ ইন্ডিয়া (SIMI)-র কার্যকলাপ এই মুর্শিদাবাদেই সবচেয়ে বেশি ছিল। এই সংগঠনটি জঙ্গি গোষ্ঠী ইন্ডিয়ান মুজাহিদিনের সঙ্গে যুক্ত ছিল। পরবর্তীতে, SIMI-র অনেক সদস্য কট্টরপন্থী সংগঠন পপুলার ফ্রন্ট অফ ইন্ডিয়া (PFI)-তে যোগ দেয় এবং মুর্শিদাবাদ পিএফআই-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটিতে পরিণত হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক ২০২২ সালের ২৮শে সেপ্টেম্বর বেআইনি কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন (UAPA)-এর অধীনে পাঁচ বছরের জন্য PFI-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।
আগে থেকেই পরিকল্পনা?
তদন্তকারীদের সন্দেহ, এই সিমি এবং পিএফআই-এর প্রাক্তন সদস্যরাও SDPI-এর সঙ্গে যুক্ত থাকতে পারে। পুলিশের মতে, মুর্শিদাবাদে SDPI-এর এখনও যথেষ্ট প্রভাব রয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, স্থানীয়দের পাশাপাশি বাইরে থেকেও বিপুল সংখ্যক লোক এই হিংসায় অংশ নিয়েছিল। এর ফলে এই হিংসাত্মক ঘটনা পূর্বপরিকল্পিত হওয়ার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
এই সন্দেহের কারণ হিসাবে পরপর কয়েকটি ঘটনাকে খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা। গত শুক্রবার প্রথম মুর্শিদাবাদের সুতিতে জাতীয় সড়ক অবরোধ করা হয়। সেখান থেকেই বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। এর অব্যবহিত পরেই, বিপুল সংখ্যক বিক্ষোভকারী রাস্তায় নেমে আসে এবং সামশেরগঞ্জে ব্যাপক হিংসা ও অগ্নিসংযোগ শুরু হয়, চলে লুটপাট।
উল্লেখ্য, সুতি ও সামশেরগঞ্জের মধ্যে দূরত্ব মাত্র দশ কিলোমিটার। যখন সুতিতে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করছে, ঠিক সেই সময় জঙ্গিপুর থেকে আসা পুলিশের একটি বড় দল সুতিতেই আটকে যায়। আর সেই সুযোগে সামশেরগঞ্জে ব্যাপক ভাঙচুর ও লুটপাট চলতে থাকে। তদন্তকারীরা মনে করছেন, সুতিতে ঘটনার সূত্রপাত হওয়ার পরপরই সামশেরগঞ্জে একই ধরনের বিক্ষোভ ও ভাঙচুর কাকতালীয় নাও হতে পারে।
সুতি ও সামশেরগঞ্জ, উভয় স্থানেই সরকারি সম্পত্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বিশেষভাবে হিন্দুদের দোকান ও বাড়ি টার্গেট করা হয়েছে বলে অভিযোগ।
তদন্তে আরও দেখা যাচ্ছে, এই হিংসাত্মক ঘটনায় অল্পবয়সী যুবক এবং নাবালকদের একটি বড় অংশ অংশ নিয়েছিল। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ খতিয়ে দেখলে দশ থেকে কুড়ি বছর বয়সীদের অস্বাভাবিক উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো।
প্রাথমিক তদন্তে আরও জানা গিয়েছে যে, উন্মত্ত হামলাকারীদের বেশিরভাগই ভিনরাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করে এবং ঈদ-উল-ফিতরের ছুটি কাটাতে মুর্শিদাবাদের বাড়িতে ফিরে এসেছিল। এই সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখে পুলিশ ঘটনার নেপথ্যে থাকা মূল ষড়যন্ত্রকারীদের চিহ্নিত করার চেষ্টা চালাচ্ছে।