৪০ বছর পর টানেলে বড় মেরামতির কাজ, মেট্রোয় পরিষেবা বন্ধের আশঙ্কা, জেনেনিন কবে থেকে?

ভারতের প্রাচীনতম মেট্রো টানেল, যা টালিগঞ্জ ও দমদমের মধ্যে উত্তর-দক্ষিণ বা ব্লু লাইন নামে পরিচিত, দীর্ঘ চল্লিশ বছর পর এবার সম্পূর্ণ পুনর্গঠনের (ওভারহল) জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। কলকাতা মেট্রো রেল কর্তৃপক্ষ এই ঐতিহাসিক টানেলের স্বাস্থ্য ফেরাতে তিন থেকে চার বছর মেয়াদী একটি বৃহৎ প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এই কাজের সময়কালে বিভিন্ন পর্যায়ে ট্রেন চলাচল আংশিক বা সম্পূর্ণরূপে বন্ধ রাখা হতে পারে বলে জানানো হয়েছে।

কলকাতা মেট্রো রেলের জেনারেল ম্যানেজার উদয় কুমার রেড্ডি এই বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিয়েছেন। তিনি জানান, টানেল ওভারহলের জন্য পরামর্শদাতা সংস্থা রাইটসকে (RITES) একটি সমীক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এই সমীক্ষায় টানেলের সিভিল স্ট্রাকচার থেকে শুরু করে ট্র্যাকের পরিকাঠামো পর্যন্ত সমস্ত দিক পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। রেড্ডি বলেন, “সমীক্ষাটি প্রায় শেষের দিকে, এবং আমরা খুব শীঘ্রই একটি বিস্তারিত রিপোর্ট পাব বলে আশা করছি।”

এছাড়াও, পুরনো স্টেশনগুলিতে যাত্রীদের সুবিধা বৃদ্ধির জন্য লিফট ও এসকেলেটর বসানোর বিষয়ে আরেকটি পৃথক সমীক্ষা চলছে বলে জানিয়েছেন জেনারেল ম্যানেজার। খরচের হিসেব চূড়ান্ত হওয়ার পরই এই প্রস্তাব রেলবোর্ডে অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

উল্লেখ্য, ১৬.৪৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেলটি ১৯৯৫ সালে চালু হয়েছিল। এটি কাট-এন্ড-কভার পদ্ধতিতে নির্মিত। ১৯৮৪ সালে কলকাতায় দেশের প্রথম মেট্রো পরিষেবা শুরু হয় এবং ২০২৪ সালে এটি ৪০ বছর পূর্ণ করেছে। দীর্ঘ এই সময়কালে শুধুমাত্র নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়েছে, কিন্তু বড় আকারের কোনও সংস্কার কাজ হয়নি। রেল আধিকারিকদের মতে, তাই এই মুহূর্তে টানেলের সম্পূর্ণ ওভারহল অত্যন্ত জরুরি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন অবসরপ্রাপ্ত মেট্রো প্রকৌশলী অতীতে টানেলে দেখা দেওয়া দুটি প্রধান সমস্যার কথা উল্লেখ করেছেন—টানেলের দেওয়াল থেকে ধস এবং ট্র্যাক ফিটিংয়ের দ্রুত ক্ষয়। জেনারেল ম্যানেজার রেড্ডির কথায়, এই সংস্কার কাজ চলাকালীন অনিবার্যভাবে পরিষেবায় কিছু সময়ের জন্য ব্যাঘাত ঘটবে।

শুধু টানেলের পরিকাঠামোই নয়, উত্তর-দক্ষিণ লাইনের সিগন্যালিং সিস্টেমকেও আধুনিকীকরণ করা হবে। বর্তমানে ব্যস্ত সময়ে (পিক আওয়ার) ট্রেন ছাড়ার ফ্রিকোয়েন্সি ৬ মিনিট রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আরও কমানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এর ফলে যাত্রীদের চলাচল আরও সহজ হবে। বিশেষত যখন ইস্ট-ওয়েস্ট করিডোরের শিয়ালদহ ও এসপ্ল্যানেড স্টেশন দুটি যুক্ত হবে, তখন এসপ্ল্যানেড স্টেশনে যাত্রীদের ভিড় বহুলাংশে বাড়বে। সেই পরিস্থিতি সামাল দিতে উন্নত সিগন্যালিং ব্যবস্থা সহায়ক হবে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই ধরনের ওভারহল বিশ্বের অন্যান্য পুরনো মেট্রো সিস্টেমের ক্ষেত্রেও একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। উদাহরণস্বরূপ, লন্ডনের আন্ডারগ্রাউন্ডে যেমন পিকাডিলি লাইনের সংস্কার কাজ চলছে, তেমনই নিউ ইয়র্ক সিটি ট্রানজিটও ৫০ বছর পর একটি বড় ধরনের সংস্কারের দিকে এগোচ্ছে। সেখানে নতুন রেলগাড়ি, পাওয়ার স্টেশন উন্নয়ন এবং চরম আবহাওয়ার মোকাবিলায় স্টেশনগুলিকে আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

কলকাতার প্রাচীন মেট্রো টানেলের এই পুনর্গঠনের পরিকল্পনা কেবল যাত্রী সুরক্ষা নিশ্চিত করাই নয়, ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান যাত্রীচাপ সামাল দিতে সক্ষম একটি আধুনিক মেট্রো ব্যবস্থার দিকেও এক গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। রেল কর্তৃপক্ষের আশা, এই ওভারহল কাজ সম্পন্ন হওয়ার পর কলকাতা মেট্রো আগামী দিনের যাত্রীদের জন্য আরও আরামদায়ক ও নিরাপদ পরিবহন মাধ্যম হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।