“মেয়ের চিকিৎসা করব কিভাবে?”-চাকরি হারিয়ে চিন্তায় দিন কাটছে শিক্ষক দম্পতির

চার বছরের কন্যাসন্তান দুরারোগ্য কোলন আলসারে আক্রান্ত। প্রতি মাসে চিকিৎসার বিপুল খরচ। তার উপর সংসারের অন্যান্য সদস্যদের মুখে অন্ন জোগানোর দায়িত্ব। এই কঠিন পরিস্থিতিতে চরম অসহায়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বারাবনির কেস দম্পতি – উজ্জ্বল কেস ও তাঁর স্ত্রী সোমা কেস। সুপ্রিম কোর্টের রায়ে সম্প্রতি দুজনেই তাঁদের শিক্ষকতার চাকরি হারিয়েছেন। উজ্জ্বল বারাবনির দোমোহনি কেলেজোরা হাই স্কুলে কেমিস্ট্রির শিক্ষক ছিলেন এবং সোমা একই এলাকার কেলেজোরা বালিকা বিদ্যালয়ে ভূগোলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এমতাবস্থায় সর্বস্বান্ত হলেও, নিজেদের অধিকার ফিরে পেতে শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার সংকল্প জানিয়েছেন তাঁরা।

বাঁকুড়ার মেজিয়ার প্রত্যন্ত গ্রাম দিঘলের বাসিন্দা উজ্জ্বল ও সোমা দুজনেই ২০১৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। উজ্জ্বল ২০১৮ সালে বারাবনিতে যোগ দেন এবং তাঁর স্ত্রী ২০১৯ সালে একই এলাকায় চাকরি পান। তাঁদের চার বছরের মেয়ে অভীপ্সা জটিল কোলন আলসারে ভুগছে। গত কয়েক বছর ধরে হায়দরাবাদে তার চিকিৎসা চলছে।

প্রতি মাসে অভীপ্সার চিকিৎসা ও পরীক্ষার জন্য কেস দম্পতির প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি দু’মাস অন্তর হায়দরাবাদে যেতে হয়, যেখানে রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসকের পরামর্শ বাবদ আরও প্রায় ৫০ হাজার টাকা ব্যয় হয়। এর পাশাপাশি, তাঁদের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্বও তাঁদের উপর। এমন কঠিন পরিস্থিতিতে আকস্মিকভাবে চাকরি হারানোর ধাক্কা তাঁদের কার্যত বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। এখন তাঁরা বুঝতে পারছেন না, এই পরিস্থিতিতে কী করবেন।

বৃহস্পতিবার বারাবনির বাড়িতে কোলের সন্তানকে নিয়ে মুষড়ে বসে থাকতে দেখা গেল উজ্জ্বল ও সোমাকে। উজ্জ্বল অসহায়ভাবে বলেন, ‘আমরা দু’জন চাকরি করছিলাম বলেই কোনও রকমে পরিস্থিতি সামাল দিচ্ছিলাম। আমাদের আর্থিক অবস্থা তেমন সচ্ছল নয়। এ বার তো একেবারে অথৈ জলে পড়লাম। মেয়ের চিকিৎসার এত খরচ কী ভাবে মেটাব, সেটাই ভেবে উঠতে পারছি না।’

এই শিক্ষকতার চাকরির আগে উজ্জ্বল প্রাইমারি, আপার প্রাইমারি ও রেলের গ্রুপ ডি পদেও চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়ানোর জেদেই তিনি সেই চাকরিগুলি ছেড়েছিলেন। কে জানত, সেই স্বপ্নের এমন পরিণতি হবে। স্ত্রী সোমাও গভীর হতাশায় নিমজ্জিত। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এক দিকে অসুস্থ মেয়ে, অন্য দিকে বৃদ্ধ বাবা-মা। আমরা যে কী কঠিন অবস্থার মধ্যে পড়েছি, তা ভাষায় বোঝানো অসম্ভব।’

তাঁরা দুজনেই গ্রামের স্কুলে বরাবর ভালো ফল করেছেন। তাঁদের স্পষ্ট বক্তব্য, যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েই তাঁরা চাকরি পেয়েছিলেন। তাহলে কেন তাঁদের জোর করে অযোগ্যদের কালো তালিকায় ফেলা হল? জীবনের এই আকস্মিক অন্ধকার তাঁদের কণ্ঠরোধ করে দিচ্ছে। তবে তাঁরা জানান, এই কান্না চেপে রেখেই নিজেদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাওয়ার জন্য তাঁরা শেষ পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবেন।