নববর্ষের আগেই কেন করা হয় নীলপুজো? জেনেনিন এই রীতি শুরুর নেপথ্যে কি রয়েছে

বাংলা বছরের বিদায় এবং বাঙালির নববর্ষের আগমন নীলপূজো দিয়েই সূচিত হয়। ২০২৫ সালে, নীলষষ্ঠী পুজো পড়েছে আগামী ১৩ এপ্রিল, রবিবার। এই বিশেষ দিনে মায়েরা তাঁদের সন্তানদের মঙ্গল কামনায় উপবাস রাখেন এবং ভগবান শিবের আরাধনা করেন। এরপরের দিন, অর্থাৎ সোমবার, পয়লা বৈশাখ – বাঙালির নববর্ষের প্রথম দিন। এমন পরিস্থিতিতে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, কেন নববর্ষের আগে নীলপুজো করা হয়? কীভাবে এই পুজোর প্রচলন হল এবং এর সঙ্গে কোন লোককথা জড়িত রয়েছে?

নববর্ষের আগেই কেন নীলপুজো?

নীলষষ্ঠীর ঠিক পরের দিন পালিত হয় চৈত্র সংক্রান্তি এবং তার পরদিনই শুরু হয় বাংলা নববর্ষ। পুরাণ অনুযায়ী, নীলষষ্ঠীর দিনেই দেবাদিদেব মহাদেবের সঙ্গে নীল চণ্ডিকার বিবাহ সম্পন্ন হয়েছিল। নীলকণ্ঠ মহাদেবের সঙ্গে এই দিনে নীল চণ্ডিকা বা নীলাবতীর বিবাহ হওয়ার কারণেই এই দিনটি নীলষষ্ঠী নামে পরিচিত। আর এই ষষ্ঠীর আরাধনাই লোকমুখে নীলপুজো নামে পরিচিত। গ্রামীণ অঞ্চলে চৈত্র সংক্রান্তিতে চরক পুজো উপলক্ষ্যে গাজনের মেলাও বসে, যেখানে ভক্তদের ঢল নামে। তবে এই নীলপুজো নিয়ে আরও একটি জনপ্রিয় লোককথা প্রচলিত আছে।

বহু বছর আগে এক ধার্মিক ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণী বাস করতেন। তাঁদের একের পর এক সন্তান অকালে মারা যাওয়ায় তাঁরা অত্যন্ত বিষণ্ণ হয়ে পড়েন এবং নিজেদের ভিটে ছেড়ে কাশীতে গিয়ে বসবাস শুরু করেন। একদিন কাশীর গঙ্গ ঘাটে স্নান সেরে ব্রাহ্মণী যখন বসেছিলেন, তখন এক বৃদ্ধা তাঁর কাছে এসে জিজ্ঞাসা করেন, “মা, তুমি এত চিন্তিত কেন?” ব্রাহ্মণী তাঁর সন্তানদের অকালমৃত্যুর কথা এবং এত প্রার্থনা করেও কোনও ফল না পাওয়ার দুঃখের কথা বৃদ্ধাকে জানান।

ব্রাহ্মণীর কথা শুনে বৃদ্ধা জানতে চান, তিনি কখনও নীলষষ্ঠী ব্রত পালন করেছেন কিনা। ব্রাহ্মণী ‘না’ বললে বৃদ্ধা পরামর্শ দেন, “চৈত্র সংক্রান্তির প্রথম দিন তুমি উপবাস করবে এবং মহাদেবের পুজো করবে। সন্ধ্যায় ঠাকুরঘরে একটি প্রদীপ জ্বালিয়ে তবেই জল পান করবে।” কথিত আছে, সেই বৃদ্ধা মহিলার কথা মতো আচার-অনুষ্ঠান পালন ও উপবাস করার পর ব্রাহ্মণী পুনরায় সন্তানের মুখ দেখেন। সেই থেকে এই নীলষষ্ঠী উপবাসের মাহাত্ম্য ছড়িয়ে পড়ে এবং স্থানীয় ভাষায় এটি নীলপুজো নামেও পরিচিত হয়। বিশ্বাস করা হয়, সেই বৃদ্ধা আর কেউ নন, স্বয়ং দেবী ষষ্ঠী ছিলেন।

নীলপুজোর সময় মাথায় রাখুন এই বিষয়গুলি:

সন্তানের সুরক্ষা কামনায় মায়েরা নীলষষ্ঠীর ব্রত পালন করেন। এই পুজোয় কিছু বিশেষ নিয়মকানুন রয়েছে যা অবশ্যই মেনে চলা উচিত।

প্রথমত, গঙ্গাজলে কাঁচা দুধ, কাঁচা হলুদের রস এবং সাদা চন্দন মিশিয়ে শিবলিঙ্গে অর্পণ করুন।
দ্বিতীয়ত, নীলষষ্ঠী পুজোর দিন, মধু, কাঁচা দুধ এবং গঙ্গাজল মিশিয়ে শিব লিঙ্গে নিবেদন করুন।
তৃতীয়ত, ২৮টি বেল পাতার উপর সাদা চন্দন লাগিয়ে শিবলিঙ্গে নিবেদন করুন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, নীলষষ্ঠীর দিন সারাদিন উপোস করে সন্ধ্যায় ভগবান ভোলেনাথ বা অঘোরেশ্বর শিবকে জল অর্পণ করতে হয় এবং তাঁর কপালে জলাভিষেক করতে হয়। এরপর কিছু সাদা ফুল এবং মরশুমি ফল শিবের মাথায় নিবেদন করা উচিত। সম্ভব হলে অপরাজিতা বা আকন্দ ফুলের মালা অর্পণ করুন এবং আপনার সন্তানের নামে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে তার মঙ্গলের জন্য অবশ্যই প্রার্থনা করুন। উপোস ভাঙার পর ফল, সাবুদানার পাশাপাশি খাঁটি ময়দা দিয়ে তৈরি খাবার গ্রহণ করা যেতে পারে। বিশ্বাস করা হয়, নীলষষ্ঠীর ব্রতের দিনে ভক্তি ভরে উপবাস করলে এবং নিয়ম মেনে চললে মহাদেব ভক্তের সকল মনস্কামনা দ্রুত পূরণ করেন।