বিশেষ: রাশমিকা যেভাবে হয়ে উঠলেন ‘জাতীয় ক্রাশ’, জেনেনিন তার ক্যারিয়ার ও প্রচেষ্টা সম্পর্কে

সাফল্য এনে দেয় তারকাখ্যাতি, আর সেই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে কেউ হয়ে ওঠেন মহাতারকা। পান অগুনতি মানুষের ভালোবাসা ও জনপ্রিয়তা। এই সাফল্যের মাপকাঠিই নির্ধারণ করে দেয় একজন শিল্পীর আকাশছোঁয়া গ্রহণযোগ্যতা। কর্মের মাধ্যমেই শিল্পী জগৎসভায় নিজের আসন পাকা করে নেন, এমন দৃষ্টান্ত সর্বত্রই বিদ্যমান।

আজ ৫ই এপ্রিল, তেমনই এক প্রতিভাবান নারীর জন্মদিন। যিনি নিজের কাজের মাধ্যমে শুধু দেশেই নন, আন্তর্জাতিক মঞ্চেও নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন। পৌঁছে গিয়েছেন অগণিত ভক্তের হৃদয়ে। তিনি আর কেউ নন, ভারতের ‘জাতীয় ক্রাশ’ খ্যাত অভিনেত্রী রাশমিকা মান্দানা। যদিও তাঁকে এই বিশেষণে ভূষিত করা হয়, তবে শুধু ভারতেই নয়, বিশ্বজুড়েই তাঁর রূপ, অভিনয় এবং মিষ্টি হাসিতে মুগ্ধ দর্শক বলে ওঠেন, ‘হায়, মান্দানা!’

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ছবি পোস্ট করে ভক্তরা প্রায়শই লেখেন, ‘পৃথিবীর সব সৌন্দর্য যেন তাঁর মধ্যে, কোনো কমতি নেই। হাসি, চাহনি সব ভয়ংকর সুন্দর, অতুলনীয়।’ অনেকেই তাঁকে রবীন্দ্রনাথের কবিতার সেই ‘সত্য’র মতো মনে করেন, যা শুধু ছবিতে আঁকা নয়, বরং বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি।

শুরুতেই যেমন বলা হয়েছে, সাফল্যই তারকা তৈরি করে, তবে রাশমিকার ক্ষেত্রে কেউ কেউ তাঁর জনপ্রিয়তার মূলে কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্যকেই প্রাধান্য দিতে চান। সম্প্রতি এই বিষয়ে কটাক্ষের শিকারও হয়েছেন তিনি। তবে সত্যিই কি শুধু রূপের জাদুই তাঁকে এত জনপ্রিয় করে তুলেছে? উত্তর খুঁজতে গেলে রাশমিকার জার্নিটা একবার ফিরে দেখা প্রয়োজন।

কনফুসিয়াস যেমন বলেছিলেন, ‘সবকিছুরই সৌন্দর্য আছে, কিন্তু সবাই তা দেখতে পায় না।’ সৌন্দর্য উপলব্ধির বিষয় হলেও, সমাজে বাহ্যিক সৌন্দর্যের কদর অনস্বীকার্য। রবীন্দ্রনাথও সেই বাস্তবতায় বলেছেন, ‘সৌন্দর্য হৃদয়ে প্রেম জাগ্রত করিয়া দেয় এবং প্রেমই মানুষকে সুন্দর করিয়া তোলে।’ তবে চলচ্চিত্র জগতে শুধু নির্দিষ্ট গড়ন বা তকমা শেষ কথা নয়। বহু শিল্পী আছেন যাঁরা এই বাঁধা ধরা ছক ভেঙেও আকাশছোঁয়া সাফল্য পেয়েছেন। তাই রাশমিকার জনপ্রিয়তার একটি কারণ অবশ্যই তাঁর সৌন্দর্য, তবে এটিই একমাত্র কারণ দাবি করা যায় না। কারণ, এই খ্যাতি তিনি একদিনে অর্জন করেননি।

মডেলিংয়ের মাধ্যমে কেরিয়ার শুরু করা রাশমিকা বিভিন্ন সৌন্দর্য প্রতিযোগিতাতেও অংশগ্রহণ করেছেন। ‘ক্লিন অ্যান্ড ক্লিয়ার ফ্রেশ ফেস অব ইন্ডিয়া’ প্রতিযোগিতায় ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসেডর হওয়ার পর বেঙ্গালুরুর লামোড টপ মডেল হান্টে ‘টিভিসি’ খেতাব জেতেন। ভারতীয় গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, এই প্রতিযোগিতাগুলিতে নির্মাতাদের নজর কাড়েন তিনি, যার ফলস্বরূপ ২০১৬ সালে কন্নড় সিনেমা ‘কিরিক পার্টি’তে অভিনয়ের সুযোগ পান। এই সিনেমার মাধ্যমেই বড় পর্দায় তাঁর অভিষেক ঘটে।

২০১৮ সালে তেলেগু সিনেমায় আত্মপ্রকাশ করেন ‘গীতা গোবিন্দম’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। অপেক্ষাকৃত কম বাজেটের এই সিনেমা বক্স অফিসে সুপারহিট হয়। এই সিনেমায় বিজয় দেবেরাকোন্ডার বিপরীতে তাঁর অভিনয় দর্শক মহলে দারুণ সাড়া ফেলে এবং তাঁদের জুটি বিশেষ জনপ্রিয়তা লাভ করে। রোমান্টিক-কমেডি ঘরানার এই সিনেমা তরুণ প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত প্রিয় হয়ে ওঠে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রাশমিকা ও বিজয়ের রসায়ন নিয়ে প্রশংসার ঝড় ওঠে এবং রাশমিকা রাতারাতি তারকাখ্যাতি পান। ২০১৯ সালে মুক্তি পাওয়া কন্নড় সিনেমা ‘ডিয়ার কমরেড’-এও তাঁর অভিনয় প্রশংসিত হয়, যেখানে আবারও তাঁর বিপরীতে ছিলেন বিজয় দেবেরাকোন্ডা। এই সিনেমায় নারী ক্রিকেটার চরিত্রে রাশমিকার সাবলীল অভিনয় বিশেষভাবে নজর কাড়ে। এরপর তেলেগু সিনেমা ‘সারিলেরু নিকিভারু’, ‘ভীষ্ম’ এবং তামিল সিনেমা ‘সুলতান’-এর মাধ্যমেও তিনি জনপ্রিয়তা ধরে রাখেন।

তবে ২০২১ সাল রাশমিকার ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বছর। ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’ সিনেমার মাধ্যমে তিনি শুধু ভারতেই নন, বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করেন এবং অগুনতি মানুষের পছন্দের অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন। যদিও ‘পুষ্পা: দ্য রাইজ’-এ শ্রীবল্লীর চরিত্রে অভিনয়ের খুব বেশি সুযোগ ছিল না, তবে ‘পুষ্পা ২’-তে সেই আক্ষেপ পূরণ হবে বলেই আশা রাখছেন দর্শক।

অন্যদিকে, সন্দীপ রেড্ডি পরিচালিত ‘অ্যানিমেলে’র ‘গীতা’ চরিত্রে রাশমিকার অভিনয় সমালোচকদেরও প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়াও, ‘ছাবা’ সিনেমাটি বক্স অফিসে নতুন রেকর্ড তৈরি করেছে, যেখানে সম্ভাজি মহারাজের স্ত্রী মহারানি ইয়েসুবাইয়ের চরিত্রে তাঁর অভিনয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

সুতরাং, এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায় যে রাশমিকা শুধু নির্দিষ্ট কোনো চরিত্রে আটকে থাকেননি, বরং প্রতিটি চরিত্রেই তিনি নিজের স্বাভাবিক ও সাবলীল অভিনয় দিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতে সক্ষম। তাঁর কৃত্রিমতাহীন সৌন্দর্য এবং সহজ-সুন্দর অভিব্যক্তি সহজেই দর্শকের মন জয় করে নেয়। তাঁর এক হাসিতেই তরুণ প্রজন্মের হৃদয়ে ঝড় ওঠে, আর এই কারণেই তিনি ভারতের ‘জাতীয় ক্রাশ’-এর তকমা পেয়েছেন।

তবে প্রশ্ন একটাই, শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য দিয়ে কি এত বন্ধুর পথ অতিক্রম করা সম্ভব? সম্ভবত, রাশমিকার প্রতিভা, কঠোর পরিশ্রম এবং চরিত্র নির্বাচনের বিচক্ষণতাই তাঁকে আজকের এই সাফল্যের শিখরে পৌঁছে দিয়েছে।