“থমথমে ক্লাসরুম, ঘণ্টা বাজাচ্ছেন হেডস্যরই!”-আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তায় শিক্ষকমহল

বৈশাখের শুরুতে কালবৈশাখীর আগমন স্বাভাবিক ঘটনা হলেও, এবার ঝড় আসেনি অন্য পথে। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে চাকরি হারিয়েছেন রাজ্যের কয়েক হাজার শিক্ষক ও অশিক্ষক কর্মী। এই অপ্রত্যাশিত ঝড় শুধু তাদের সংসারেই নয়, আছড়ে পড়েছে বিদ্যালয়গুলিতেও।
রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভেসে আসছে বিপর্যস্ত স্কুলের ছবি। কোথাও ক্লাসের পর ক্লাস ফাঁকা, নেই নিয়মিত শিক্ষক। কোনো বিদ্যালয়ে একাধিক বিষয়ের শিক্ষকের অভাব দেখা দিয়েছে। এমনকি, কোথাও ঘণ্টা বাজানোর লোক না থাকায় সেই দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে খোদ প্রধান শিক্ষককে। চাকরি হারানোর ধাক্কা কতটা গভীর হতে পারে, তার এক মর্মান্তিক উদাহরণ মিলেছে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে, যেখানে চাকরি হারানো এক শিক্ষিকার আত্মহত্যার চেষ্টার খবর পাওয়া গেছে। সবমিলিয়ে, রাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থায় এক গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
ঝাড়গ্রামের বিরিহান্ডি হাইস্কুলের শুক্রবারের চিত্র দেখলে বোঝার উপায় নেই যে একদিন আগেও এই স্কুল ছাত্র-শিক্ষকদের কলরবে মুখরিত ছিল। এদিন স্কুল শুরু হওয়ার পর দেখা যায়, বহু ক্লাসে কোনো শিক্ষক নেই। শিক্ষকের টেবিলে চক ও ডাস্টার পড়ে থাকলেও, ছাত্ররা নিজেরাই রুটিন মেনে পড়াশোনা শুরু করে দেয়। অন্যান্য দিন শিক্ষক না থাকলে ক্লাসে যে হইচই দেখা যায়, এদিন তেমন কিছুই চোখে পড়েনি। এক নীরব, থমথমে পরিবেশ বিরাজ করছে যেন কোনো বড় ঝড়ের পূর্বাভাস। স্কুলের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মীর চাকরিও গিয়েছে। প্রধান শিক্ষককে দেখা যায় নিজের ঘরে বসে ঘন ঘন ঘড়ি দেখতে, কারণ ক্লাস শেষে তিনিই ঘণ্টা বাজাতে বাধ্য।
বৃহস্পতিবার গভীর রাতে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ক্যানিংয়ে এক স্থানীয় স্কুলের ইতিহাসের শিক্ষিকাকে তার ভাড়া বাড়ি থেকে অচৈতন্য অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। তিনিও সুপ্রিম কোর্টের রায়ে চাকরি হারিয়েছেন। রাতে ফোনে তার সাড়া না পেয়ে এক আত্মীয় এসে তাকে উদ্ধার করে ক্যানিং মহকুমা হাসপাতালে ভর্তি করেন। শিক্ষিকার বাড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের গড়বেতায়। তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী এবং সম্প্রতি তার বিবাহবিচ্ছেদ হয়েছে। জানা গেছে, বেশ কয়েকজনের কাছে তার ঋণও ছিল। রাতে পাওনাদারেরাও তার বাড়িতে গিয়েছিলেন। তবে এটি আত্মহত্যার চেষ্টা ছিল কিনা, তা নিশ্চিতভাবে জানাতে পারেননি পরিবারের সদস্যরা।
পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণা রোডের ধামকুড়া গ্রামের শিক্ষক শান্তিনাথ ভূঁইয়া এবং তার স্ত্রী রুবি চোংদারের পরিবারেও নেমে এসেছে ঘোর অন্ধকার। ২০১৮ সালে দুজনেই পৃথক জেলায় চাকরি পেয়েছিলেন। শান্তিনাথ হুগলির গোপাল চন্দ্র সেন হাইস্কুলে দর্শনের শিক্ষক ছিলেন এবং রুবি একই জেলার গোঘাট বালিকা বিদ্যালয়ে পদার্থবিজ্ঞানের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। সুপ্রিম কোর্টের এক রায়ে তাদের দুজনেরই চাকরি চলে গেছে। রুবি আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘অযোগ্যদের তালিকায় আমাদের নাম কখনও ওঠেনি। তাহলে কেন আমাদের চাকরি গেল? দুই বাড়িতে একাধিক দায়িত্ব। সংসার চালাব কী করে?’
শুক্রবার মেদিনীপুর শহরের কালেক্টরেট মোড়ে চাকরিহারা শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রতীকী পথ অবরোধ করেন। পূর্ব মেদিনীপুরের ময়নার বিবেকানন্দ কন্যা বিদ্যাপীঠ স্কুলে ১৩ জন শিক্ষিকার চাকরি গিয়েছে, যার ফলে সেখানে বাংলা বিষয়ের কোনো শিক্ষকই আর অবশিষ্ট নেই। স্কুল কর্তৃপক্ষ গভীর চিন্তায়, কিভাবে বিদ্যালয় পরিচালনা করবেন। কেশপুরের এক বাসিন্দা গ্রাম পঞ্চায়েতের চাকরি ছেড়ে উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছিলেন এবং ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে বাড়ি তৈরি করেছিলেন। লোনের কিস্তি কিভাবে পরিশোধ করবেন, এই চিন্তায় তার রাতের ঘুম উড়ে গেছে।
এই পরিস্থিতিতে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ এবং বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষাদানের অভাব এক উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।