চাকরি বাতিলের পর শিক্ষকরা কি স্কুলে আসবেন? বেতনই বা কবে পর্যন্ত? ধোঁয়াশা কাটাল বিকাশ ভবন

সুপ্রিম কোর্টের বৃহস্পতিবারের ঐতিহাসিক রায়ের জেরে রাজ্যের মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের ২৫,৭৫২ জন শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। শুক্রবার থেকেই অনেককে স্কুলে দেখা যায়নি, তবে সকলেই অনুপস্থিত ছিলেন না। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হল, যাদের চাকরি গেল, তারা কি আদৌ স্কুলে আসতে পারেন? এলেও কি এপ্রিল মাসের বেতন পাবেন? আর ঠিক কবে থেকে তাদের চাকরি আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হবে?
এই সমস্ত প্রশ্নের সম্ভাব্য উত্তর দিয়েছে বিকাশ ভবন। স্কুলশিক্ষা দপ্তরের আধিকারিকরা স্পষ্ট জানিয়েছেন যে শীর্ষ আদালতের রায়ের পর চাকরি আর থাকছে না, এটা নিশ্চিত। গত বছর কলকাতা হাইকোর্টের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ের পরেও কিছুটা আশা থাকলেও, সুপ্রিম কোর্টের রায় সেই সম্ভাবনাও শেষ করে দিয়েছে।
তবে বিকাশ ভবনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আদালতের রায় কার্যকর করতে রাজ্য সরকারকে প্রথমে এই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের নিয়োগের সুপারিশকারী স্কুল সার্ভিস কমিশনকে (এসএসসি) নির্দেশ দিতে হবে। সেই নির্দেশ পাওয়ার পর এসএসসি এই ২৫,৭৫২ জনের নিয়োগের সুপারিশ বাতিলের জন্য মধ্যশিক্ষা পর্ষদকে চিঠি দেবে। এরপর পর্ষদ প্রতিটি প্রার্থী এবং সংশ্লিষ্ট স্কুলকে আলাদাভাবে নিয়োগ বাতিলের চিঠি পাঠাবে।
বিকাশ ভবনের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে এবং শিক্ষক-শিক্ষিকা ও শিক্ষাকর্মীদের হাতে চাকরি বাতিলের চিঠি পৌঁছানো পর্যন্ত, তারা চাইলে স্কুলে আসতে পারেন। সেক্ষেত্রে তাদের ওই সময়ের বেতন পেতেও কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। তবে যদি কেউ নৈতিক বা সামাজিক কারণে স্কুলে যেতে না চান, তবে সেই বিষয়ে স্কুলশিক্ষা দপ্তরের কিছু বলার নেই।
উল্লেখ্য, বছরখানেক আগেই কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি দেবাংশু বসাকের ডিভিশন বেঞ্চের রায়ে এই একই সংখ্যক শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীর চাকরি বাতিল হয়েছিল। তখনও একই পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছিল। তাই আইনিভাবে এখনই স্কুল ফাঁকা হয়ে যাওয়ার কোনো কারণ দেখছে না বিকাশ ভবন। বরং শিক্ষা আধিকারিকরা মনে করছেন, এই শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের আলাদা আলাদাভাবে বরখাস্তের চিঠি ইস্যু করতে কিছুটা সময় লাগবে।
শিক্ষামন্ত্রী ব্রাত্য বসু এই বিষয়ে বলেন, ‘মুখ্যমন্ত্রী যে বার্তা দিয়েছেন, তাতে শিক্ষকদের কী করণীয়, কী নয়—সেটা তিনি স্পষ্ট ভাবেই জানিয়েছেন। আমাদের কাছে এমন কোনও তথ্য নেই যে শিক্ষকরা স্কুলে যাচ্ছেন না।’ শিক্ষকদের স্কুলে আসা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষামন্ত্রী সরাসরি কোনো উত্তর না দিয়ে বলেন, ‘আমি তো এমন কথা বলতে পারি না। মুখ্যমন্ত্রী মানবিক বার্তা দিয়েছেন, আমি বলছি শিক্ষকরা তাঁর উপরেই ভরসা রাখুন।’
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর বর্ধমান নিবেদিতা কন্যা বালিকা বিদ্যালয়ের তিন শিক্ষিকা ও এক গ্রুপ-ডি কর্মীর চাকরি হারানোর পরেও তারা শুক্রবার স্কুলে এসেছিলেন এবং শিক্ষিকারা ক্লাসও নিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, সুস্থ সমাজ গড়ার লক্ষ্য নিয়ে শিক্ষকতা পেশা বেছে নিয়েছিলেন, সমাজ যদি তাদের অযোগ্য মনে করে তবে তাদের অপরাধ কোথায়? প্রধান শিক্ষিকা স্বাগতা মণ্ডল কোনার জানান, স্কুলশিক্ষা দপ্তর বা জেলা বিদ্যালয় পরিদর্শক (ডিআই) অফিস থেকে কোনো নির্দেশিকা না পাওয়ায় তারা স্কুলে এসেছেন।
তবে রাজ্যের অনেক স্কুলে এর বিপরীত চিত্র দেখা গেছে। চাকরিহারা বহু শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী স্কুলে অনুপস্থিত ছিলেন, যার ফলে প্রধান শিক্ষক-শিক্ষিকাদের স্কুল চালাতে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বর্ধমানের কৃষ্ণপুর হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক সৌমেন কোনার জানান, চাকরিহারা শিক্ষক ও কর্মীরা না আসায় স্কুল চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার ঝাপবেড়িয়া হাইস্কুলে আটজন শিক্ষক ও একজন ক্লার্কের মধ্যে ছয়জন শুক্রবার স্কুলে আসেননি। উচ্চ মাধ্যমিকের তিনজন শিক্ষকেরও চাকরি যাওয়ায় পঠন-পাঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। স্কুলের সহকারী শিক্ষক অনিমেষ হালদার উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দ্বাদশের ক্লাস শুরু হতে চলেছে এবং মাধ্যমিকের ফল বেরোনোর পর একাদশে কিভাবে ক্লাস নেওয়া হবে তা নিয়ে তারা চিন্তিত।
বিকাশ ভবনের স্পষ্টীকরণে কিছুটা ধোঁয়াশা কাটলেও, চাকরিহারা শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীদের ভবিষ্যৎ এবং স্কুলগুলিতে পঠন-পাঠনের স্বাভাবিকতা বজায় রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।