“ধর্ম আগে, না দুর্নীতি আগে!”-বাংলার রাজনীতিতে ধন্দে বিজেপি

নিয়োগ দুর্নীতিতে প্রায় ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিলের নজিরবিহীন ঘটনা বিজেপিকে রীতিমতো ধর্মসঙ্কটে ফেলেছে। এতদিন তৃণমূল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগকে হাতিয়ার করে ভোট ময়দানে ঝাঁপানো গেরুয়া শিবির এখন ভাবছে, আসন্ন ’২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ধর্মীয় মেরুকরণের কৌশল ধরে রাখবে, নাকি দুর্নীতিকেই প্রধান অস্ত্র করবে?
অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনে সারদা, নারদের মতো দুর্নীতি ইস্যুকে সামনে এনেও বিজেপি তেমন সুবিধা করতে পারেনি। বরং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতাদের কাছে বারবার পরাজিত হতে হয়েছে তাদের। এই পরিস্থিতিতে বঙ্গ রাজনীতিতে দুর্নীতি আদৌ কোনও বড় ইস্যু কিনা, সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে পদ্ম শিবিরে।
এই সংশয়ের জেরেই বিজেপি মূলত ধর্মীয় মেরুকরণের পথে হেঁটেছে। হিন্দু ভোট এককাট্টা করাই এখন তাদের প্রধান লক্ষ্য। শুভেন্দু অধিকারী, দিলীপ ঘোষের মতো নেতারা প্রকাশ্যেই মুসলিম ভোটের তোয়াক্কা না করার কথা বলছেন এবং হিন্দু ভোট একত্র হলেই তৃণমূলকে ক্ষমতাচ্যুত করা যাবে বলে দাবি করছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, এ বছর রামনবমী নিয়ে বিজেপি নেতাদের ব্যাপক উৎসাহ সেই ধর্মীয় মেরুকরণকে আরও তীব্র করার চেষ্টা। রবিবার দেড় কোটি হিন্দুকে রাজপথে নামানোর লক্ষ্য নিয়েছে গেরুয়া ব্রিগেড।
তবে এই আবহের মধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের রায়ে ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল রাজ্য রাজনীতিতে নতুন তরঙ্গ তুলেছে। এই পরিস্থিতিতে বিজেপি কি তাদের পুরনো ধর্মীয় মেরুকরণের পথেই অবিচল থাকবে, নাকি অগ্রাধিকার বদলে তৃণমূলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আরও জোরালো করবে? এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে বিজেপি শিবিরে।
দলের এক প্রবীণ নেতা মনে করছেন, তৃণমূলের দুর্নীতির কারণেই এত সংখ্যক শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে বিরোধী দল হিসেবে পথে না নামলে মানুষ তাদের ক্ষমা করবে না। তিনি আরও মনে করেন, এত বড় দুর্নীতিকে ইস্যু না করলে বামেরা সেই সুযোগ নিয়ে নিতে পারে। যদিও রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার এখনই কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে চাইছেন না। তিনি তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের কথা বললেও আপাতত রামনবমীতেই মনোযোগ দিতে চান।
বৃহস্পতিবার সুকান্ত মজুমদার বলেছিলেন, রামনবমীর পরেই তারা তৃণমূলের দুর্নীতির বিরুদ্ধে বড়সড় আন্দোলন শুরু করবেন। তবে শুক্রবার দিল্লিতে দলের কেন্দ্রীয় দপ্তরে সুকান্ত এবং সম্বিৎ পাত্র নিয়োগ দুর্নীতি ইস্যুতে তৃণমূলকে তীব্র আক্রমণ করেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রী সহ গোটা ক্যাবিনেটের গ্রেপ্তারি দাবি করেছেন। সুকান্তর দাবি, চাকরিহারাদের টাকা মুখ্যমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল এবং তৃণমূল নেতাদের কাছ থেকে আদায় করে ফেরত দেওয়া হোক। এ দিন বিজেপি সাংসদরা দিল্লিতে বঙ্গভবন ঘেরাও করার চেষ্টাও করেন, যেখানে সুকান্তকে পুলিশ আটক করে। কলকাতায় বিধানসভার বাইরে শুভেন্দু অধিকারীও একই সুরে তৃণমূলকে আক্রমণ করেছেন। তবে রবিবার রামনবমী পালনে কোনও খামতি না রাখার বিষয়েও তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন।
বঙ্গ বিজেপির একাংশের মধ্যে অবশ্য ভিন্ন মত শোনা যাচ্ছে। তাদের মতে, লোহা গরম থাকতেই আঘাত হানা উচিত ছিল। দলের এক বর্ষীয়ান নেতার মন্তব্য, সুপ্রিম কোর্টের রায় ঘোষণার পরেই রাজ্য অচল করে দেওয়া উচিত ছিল, কিন্তু তারা রবিবার পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এখন এটাই দেখার, বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণের পথে হেঁটে পুরনো কৌশল বজায় রাখে, নাকি দুর্নীতিকে প্রধান অস্ত্র করে নতুন রণকৌশল তৈরি করে আগামী বিধানসভা নির্বাচনের জন্য প্রস্তুতি নেয়। ২৬ হাজার শিক্ষকের চাকরি বাতিল নিঃসন্দেহে একটি বড় ইস্যু এবং বিজেপি এই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারে, সেটাই এখন দেখার।