“বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পে বড় আঘাত, সুবিধা পাবে ভারত”-বলছে রয়টার্সের প্রতিবেদন

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতি বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের জন্য বড় ধরনের অশনি সংকেত বয়ে এনেছে। বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) ঘোষিত এই নীতি অনুযায়ী, বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৭ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। যা এশিয়ার এই স্বল্পোন্নত দেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি খাতকে কঠিন সংকটের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বৃহস্পতিবার সকালে এই অপ্রত্যাশিত ঘোষণা শুনে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকরা। রপ্তানিকারক শাহিদুল্লাহ আজিম হতাশার সুরে বলেন, “আমরা জানতাম যে কিছু একটা আসছে, কিন্তু এত বড় ধাক্কা আসবে তা কল্পনাও করিনি। এটি আমাদের ব্যবসার জন্য এবং এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত হাজার হাজার শ্রমিকের জন্য ভয়ংকর খবর।”

আজিমের প্রতিষ্ঠান উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন খ্যাতনামা খুচরা বিক্রেতাদের কাছে পোশাক সরবরাহ করে। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই নতুন শুল্কের কারণে বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে বিকল্প বাজারের দিকে ঝুঁকতে পারে, যা আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানকে দুর্বল করে দেবে।

বাংলাদেশের বাজার ও অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্রের এই শুল্কনীতির সুদূরপ্রসারী নেতিবাচক প্রভাব বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পড়তে পারে।

সরকারের কাছে সহায়তা চাইল পোশাক খাত:

বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ৮০ শতাংশের বেশি জোগান দেয় এবং প্রায় ৪০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। এছাড়াও, দেশের জিডিপির প্রায় ১০ শতাংশ এই শিল্প থেকে আসে। এমতাবস্থায়, এই নতুন শুল্ক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এক বড় ধরনের আঘাত হানতে পারে। ট্রাম্পের ঘোষণার পরপরই বাংলাদেশের পোশাক শিল্প উদ্যোক্তারা পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কাছে জরুরি ভিত্তিতে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিকেএমইএ)-এর একজন শীর্ষ প্রতিনিধি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যেই সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি এবং তারা বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখছে।”

এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ কী করতে পারে?

অর্থনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশকে এখন সুচিন্তিত কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এর মধ্যে সর্বাগ্রে প্রয়োজন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার করা। একইসঙ্গে, বিকল্প বাজার অনুসন্ধান এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের মতো সম্ভাবনাময় বাজারে রপ্তানি বৃদ্ধির জন্য কার্যকর কৌশল প্রণয়ন করা জরুরি।

এছাড়াও, রপ্তানিকারকদের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য সরকারকে বিশেষ আর্থিক ও নীতি সহায়তা প্রদান করতে হবে। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প নেতারা মনে করছেন, এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় অপরিহার্য।

বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য এবং একটি ঘনিষ্ঠ বন্ধু রাষ্ট্র। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য সংক্রান্ত আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি এবং আমরা আশাবাদী যে এই আলোচনা শুল্ক সংক্রান্ত সমস্যা সমাধানে সহায়ক হবে।”

ভারতের জন্য সুযোগ:

বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, বাংলাদেশের এই সম্ভাব্য বিপর্যয় প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের জন্য একটি নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। পোশাক প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ইভিন্স গ্রুপের প্রধান আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী বলেন, “গত বছর বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখা দেওয়ার পর থেকেই অনেক মার্কিন ক্রেতা ভারতকে একটি বিকল্প উৎস হিসেবে বিবেচনা করছিল। এখন এই নতুন শুল্কের কারণে সেই প্রবণতা আরও বাড়বে।”

ভারতীয় পোশাক রপ্তানির ওপর ট্রাম্পের ধার্য করা শুল্কের হার ২৭ শতাংশ, যা বাংলাদেশের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। একটি সাম্প্রতিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ ৩০টি পোশাক ব্র্যান্ড বাংলাদেশ থেকে তাদের ক্রয়াদেশ ভারতের দিকে সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা করছে, যা বাংলাদেশের জন্য একটি বড় ধাক্কা হতে পারে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মোট পোশাক আমদানির মাত্র ৬-৭ শতাংশ আসে ভারত থেকে, যা বাংলাদেশ ও ভিয়েতনামের তুলনায় অনেক কম। তবে, নতুন পরিস্থিতিতে ভারত এই বাজারে নিজেদের অংশীদারিত্ব আরও বাড়িয়ে নিতে পারে।

আঘাত শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পেও:

বাংলাদেশের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কার পোশাক শিল্পও ট্রাম্পের নতুন শুল্কনীতির বড় ক্ষতির সম্মুখীন হতে চলেছে। শ্রীলঙ্কান পণ্যের ওপর ৪৪ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, যা বাংলাদেশের চেয়েও বেশি। শ্রীলঙ্কার প্রায় ৪০ শতাংশ পোশাক রপ্তানি যুক্তরাষ্ট্রে হয়ে থাকে, যার মাধ্যমে গত বছর দেশটি ১ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করেছে। পোশাক শিল্প শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী খাত, যেখানে প্রায় ৩ লক্ষ মানুষ কর্মরত।

শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্টের কার্যালয় থেকে এক বিবৃতিতে জানানো হয়েছে, সরকার একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে, যারা নতুন শুল্কের সম্ভাব্য প্রভাব বিশ্লেষণ করবে এবং প্রয়োজনীয় প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেবে। শ্রীলঙ্কার যৌথ পোশাক সমিতির সেক্রেটারি জেনারেল ইয়োহান লরেন্স বলেন, “শ্রীলঙ্কা খুব দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রের বাজার হারাতে পারে, কারণ ক্রেতারা কম শুল্কের দেশগুলোতে তাদের ক্রয়াদেশ স্থানান্তর করতে পারেন। এই বিষয়টিকে একটি জাতীয় জরুরি ইস্যু হিসেবে বিবেচনা করা উচিত।”

সূত্র: রয়টার্স