“আমেরিকার সঙ্গে পুরোনো সম্পর্ক ‘শেষ’”-জানিয়ে দিলেন কানাডার প্রধানমন্ত্রী

চলতি বছরের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় দফায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ক্ষমতায় ফিরে আসা ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেতৃত্বে বিশ্বে আবারও বাণিজ্যযুদ্ধের আগুন জ্বলে উঠেছে। তিনি কানাডা থেকে আমদানি করা সব পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছেন। এরপর গত বুধবার তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা যানবাহন ও যানবাহনের যন্ত্রাংশের ওপরও ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে তিনি “স্থায়ী পদক্ষেপ” বলে উল্লেখ করেছেন। এই সিদ্ধান্তে কানাডাসহ অন্যান্য দেশের অর্থনীতি ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দেশটির পুরোনো সম্পর্ক “শেষ” হয়ে গেছে বলে মন্তব্য করেছেন। শুক্রবার (২৮ মার্চ) ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে।
কার্নির কঠোর প্রতিক্রিয়া
মার্ক কার্নি বলেছেন, “আমাদের অর্থনীতির গভীরতর সংহতকরণ এবং কঠোর নিরাপত্তা ও সামরিক সহযোগিতার ওপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কানাডার যে পুরোনো সম্পর্ক ছিল, তা শেষ হয়ে গেছে।” অটোয়ায় মন্ত্রিসভার বৈঠকের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি ট্রাম্পের শুল্ক আরোপকে “কানাডার অর্থনীতির ওপর সরাসরি আক্রমণ” হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি জানান, এই পরিস্থিতিতে কানাডিয়ানদের “অর্থনীতিকে মৌলিকভাবে পুনরায় পরিকল্পনা” করতে হবে।
কার্নি আরও বলেন, “কানাডা প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের মাধ্যমে ট্রাম্পের এই পদক্ষেপের জবাব দেবে। আমাদের লক্ষ্য হবে এমনভাবে প্রতিক্রিয়া জানানো, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সর্বোচ্চ প্রভাব পড়ে।” তিনি স্পষ্ট করেছেন যে, কানাডা এমন একটি অর্থনীতি গড়ে তুলতে চায়, যা কানাডিয়ানরা নিজেরা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং এর জন্য অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা করা হবে।
ঐতিহাসিক চুক্তির অবসান
লিবারেল পার্টির নেতা কার্নি ১৯৬৫ সালে স্বাক্ষরিত কানাডা-মার্কিন অটোমোটিভ পণ্য চুক্তিকে তাঁর জীবদ্দশায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। ফরাসি ভাষায় তিনি বলেন, “ট্রাম্পের এই শুল্কের মাধ্যমে সেই চুক্তি শেষ হয়ে গেছে।” এই চুক্তি দুই দেশের মধ্যে অটোমোবাইল শিল্পের বাণিজ্যকে সহজতর করেছিল, কিন্তু নতুন শুল্ক এই সম্পর্ককে ভেঙে দিয়েছে বলে মনে করেন তিনি।
কানাডার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
কার্নি জানান, “কানাডিয়ানদের ভবিষ্যতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শক্তিশালী বাণিজ্য সম্পর্ক রাখার সম্ভাবনা আছে কিনা, তা পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখতে হবে।” তিনি জোর দিয়ে বলেন, কানাডার অর্থনীতিকে এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে যাতে এটি যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল না হয়। এর অংশ হিসেবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক জোরদার করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ট্রাম্পের শুল্কঘোষণা
ট্রাম্প গত বুধবার ঘোষণা করেন যে, তিনি যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি করা সব যানবাহন ও যন্ত্রাংশের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করবেন। এর আগে তিনি কানাডার সব পণ্যে একই হারে শুল্ক আরোপ করেছিলেন। তিনি এই পদক্ষেপকে “স্থায়ী” বলে উল্লেখ করে জানান, এটি যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি ও শিল্পকে রক্ষা করার জন্য গৃহীত। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত কানাডার অটোমোবাইল শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি করেছে।
প্রভাব ও প্রতিক্রিয়া
কানাডার অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। দেশটির রপ্তানির বড় অংশ যুক্তরাষ্ট্রে যায়, বিশেষ করে অটোমোবাইল ও শক্তি খাতে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ফলে কানাডার এই শিল্পগুলো মারাত্মক চাপের মুখে পড়তে পারে। কার্নির নেতৃত্বে কানাডা ইতিমধ্যে প্রতিশোধমূলক শুল্ক আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধকে আরও তীব্র করতে পারে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই শুল্কযুদ্ধ উত্তর আমেরিকার অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলবে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তার মুখে।