“সূর্য ডুবলো আরাবল্লির কোলে” পাহাড়ের চূড়ায় মিলিয়ে গেল শেষ আলো’, অতঃপর:

মোবাইল স্ক্রিনে “নো সার্ভিস” লেখাটাই যেন মুক্তির বার্তা বয়ে আনল। হোয়াটসঅ্যাপ-ফেসবুকের নোটিফিকেশন, ট্রাম্প-পুতিনের খবর, আইপিএলের হৈচৈ—সবই রয়ে গেল দূরের পৃথিবীতে। শুধু রয়ে গেল পলাশ ফুলের ছবি তোলার আনন্দ, ঝোঁরার শব্দ আর পাখিদের অদৃশ্য সংলাপ। রিজর্টের কটেজে পৌঁছানোর পর প্রথমবারের মতো টের পেলাম—”সময়” আসলে কতটা ধীর গতিতে চলতে পারে।

সূর্যাস্ত যেন রঙের মহাযজ্ঞ

সন্ধ্যা ৬:৪০। টেবল টপে দাঁড়িয়ে দেখা সানসেটটা ছিল প্রকৃতির ক্যানভাসে রঙের মার্কাটারি খেলা। সূর্য ডুবল পাহাড়ের আড়ালে, কিন্তু আলো রয়ে গেল মনে। কটেজের সামনের ঝোঁরায় পলাশের প্রতিবিম্ব দেখে মনে হচ্ছিল, প্রকৃতি নিজেই যেন জলছবি আঁকছে। রাতের খাবারের পর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অনুভব করলাম—এখানে মানুষের তৈরি একমাত্র শব্দ হলো ঘণ্টায় একবার দূরের রাস্তা দিয়ে যাওয়া গাড়ির শব্দ। বাকি সবই পাখি, ব্যাঙ আর ঝিঁঝিঁ পোকার সিম্ফনি।

যুগলপ্রসাদের জঙ্গল, গাছের গন্ধের ভাষা

জঙ্গলের রক্ষক যুগলপ্রসাদের সঙ্গে আলাপ হল অন্ধকারে। তিনি প্রতিটি গাছের গায়ে হাত বুলিয়ে বলেন, “হর পেঢ় সে খুশবু আ রহা হ্যায়।” আমি গন্ধ পাইনি, কিন্তু বিশ্বাস করলাম—যে মানুষ গাছের গোড়ায় জল দেয়, সে নিশ্চয়ই তাদের নিঃশ্বাস শুনতে পায়। এই নির্জনতায় প্রথমবার টের পেলাম, আমাদের শহুরে জীবন আসলে কতটা “মাল্টি-টাস্কিং”-এর দাসত্বে জড়িয়ে গেছে: ফোনে কথা বলা, ওটিপি দেওয়া, রিল ভাইরাল করার চেষ্টা—সবই যেন পিছনে আগুন জ্বালিয়ে রাখা।

সকাল যে কত নীরব হতে পারে

পরদিন সকালে মোবাইল না দেখেই শুরু করলাম দিন। চা বানানোর সময় লক্ষ করলাম—পলাশ ফুলে মধু খাওয়া পাখিরা আমার চেয়ে বেশি ব্যস্ত। ৯টার অফিসের সাইরেন, পেমেন্টের রিমাইন্ডার, মিটিংয়ের ঝামেলা—কিছুই নেই। শুধু আছে বারান্দায় দাঁড়িয়ে এক কাপ চায়ের সঙ্গে নিজেকে আবিষ্কারের সুযোগ। বাথরুমের পাহাড়মুখী জানালা খুলে দিতেই মনে হল, প্রকৃতি যেন স্নানের জলে সামিল হতে চায়।

শেষ কথা: বিষমুক্তির দিনলিপি

এই দুই দিনের অভিজ্ঞতা ছিল শরীর থেকে ডিজিটাল বিষ বের করে দেওয়ার মতো। জানলাম—নিজের সঙ্গে কথা বলার, বই পড়ার, ফোটো দেখার এমনকি শুধু দাঁড়িয়ে থাকারও একটা আনন্দ আছে। ফিরে আসার সময় গাড়িতে আবার পরলাম সেই কালো গগলস্। কিন্তু এবার অন্ধকারে ভয় পাইনি—কারণ জানতাম, ওই অন্ধকারের পরেই আছে পলাশের লাল আর নির্জনতার নির্মল স্বাদ।