বিশেষ: ঘুমের মধ্যে এখনও পরীক্ষা দেয়ার স্বপ্ন দেখেন? জেনেনিন কেন এমন হয় ?

অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বড় এক বিভীষিকা হল পরীক্ষা। অনেকে যেমন রাত জেগে পড়াশোনা করে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিয়ে থাকেন, ঠিক তেমনই টেনশনে অনেকের স্বপ্নেও পরীক্ষার হল চলে আসে।

২০২৫ সালের জুনে যুক্তরাজ্যের লিডস সিক্সথ ফর্ম কলেজ থেকে এ-লেভেলস পরীক্ষা দেবেন ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী ওলুওয়াটোসিন।

তিনি আগেও বেশ কয়েকবার স্বপ্নে পরীক্ষার হল দেখেছেন। পরীক্ষার প্রহর ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে যে এক ধরনের দুঃস্বপ্ন আসতে শুরু করবে সে বিষয়টিও ভালো করে জানা ওলুওয়াটোসিনের।

দুঃস্বপ্নটি হল, ওলুওয়াটোসিন নিজেকে পরীক্ষার হলে দেখতে পাচ্ছেন। আর তার সামনে অংকের প্রশ্নপত্র। এদিকে, তিনি প্রস্তুতি নিয়েছেন পরিসংখ্যান ও মেকানিক্স বিষয়ে। আর প্রশ্নপত্রে সব এমন প্রশ্ন, যা জীবনেও তিনি দেখেননি।

এর পরপরই তিনি মাথাব্যাথা নিয়ে ঘুম থেকে জেগে উঠেন ও ঘামতে থাকেন। তবে, এটা যে স্বপ্ন ছিল, তা বুঝতে পেরে আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন।

পরীক্ষা নিয়ে স্বপ্ন দেখা যে সাধারণ বিষয়, তা জানার কোনো উপায় নেই। কারণ, সকলে এ ধরনের স্বপ্ন মনে রাখতে পারেন না।

কিন্তু এ ধরনের স্বপ্ন কেন আসে? এটি থামানোর কোনো উপায় আছে কি?

ইউনিভার্সিটি অফ অক্সফোর্ডের স্লিপ মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক কলিন এস্পি বলছেন, মানুষ ঘুমন্ত অবস্থায় থাকার সময়ও তার মস্তিষ্ক জেগে থাকে। আর সেটি ব্যস্ত থাকে মানুষ কি শিখেছে, তা স্মৃতিতে ধরে রাখতে ও এর আবেগ প্রক্রিয়াকরণে।

তবে এর থেকে যে ‘আউটপুট’ তৈরি হয়, তাকে আমরা স্বপ্ন হিসেবে চিনি।

“আমাদের মস্তিষ্কে যেসব উপাদান কাজ করছে, তার খুঁটিনাটি বিষয়গুলোই আমাদের স্বপ্নে আসে,” বলেন এস্পি।

বিবিসি বলছে, পরীক্ষা নিয়ে স্বপ্ন মানুষকে এ বিষয়ে ‘আশ্বস্ত’ করতে সাহায্য করা উচিৎ। ফলে, মানুষের অজান্তেই অনেক কিছু শেখা হয়ে যায়।

“রাতের বেলা যা ঘটছে, তা সম্ভবত আপনার মস্তিষ্কই আপনাকে বলে দিচ্ছে… ‘আপনি জানেন এটা শঙ্কার বিষয়, আপনি জানেন কিছু করতে হবে, আর আপনি এটি নিয়ে কাজ করছেন।”

“তার মানে এমনটা নয় যে দিনের বেলায় পড়াশোনা করতে হবে না। মস্তিষ্ক শুধু সে স্মৃতিই সমন্বিত করতে পারে, যা আপনি শিখতে চাচ্ছেন।”

প্রশ্ন হলো, মানুষের জীবনে তো অনেক কিছুই ঘটে থাকে। তাহলে, পরীক্ষার বিষয়টিই স্বপ্নে আসে কেন?

“স্বপ্নে হুমকিস্বরূপ কিছু দেখা খুবই সাধারণ বিষয়,” বলেন অধ্যাপক এস্পি।

তিনি আরও যোগ করেন, কোনও কিছু হুমকিস্বরূপ হওয়ার মানে সেটি খারাপ, বিষয়টি এমন নয়। তবে এর মানে দাঁড়াতে পারে, এটি চ্যালেঞ্জিং কিছু একটা। আর সংজ্ঞানুসারেই পরীক্ষা একটি চ্যালেঞ্জিং বিষয়।

“বেশিরভাগ মানুষই পরীক্ষা নিয়ে এত আগে থেকে চিন্তা করেন না।”

“এটা দিনের বেলায় আমাদের মাথায় থাকে। তাই রাতে এমন স্বপ্ন দেখায় মোটেও অবাক হওয়ার কিছু নেই।”

আবেগী স্বপ্ন

১৯ বছরের শিক্ষার্থী জুহাল প্রায়ই স্বপ্ন দেখেন, তিনি পরীক্ষার হলে দেরি করে পৌঁছেছেন।

“আমি সময় দেখার জন্য অ্যালার্ম বাজার আগেও দুই থেকে তিনবার ঘুম থেকে জেগে উঠি,” বলেন তিনি।

“আমার মনে হয়…আমার আরও ঘণ্টাখানেক ঘুমানো উচিৎ, কিন্তু আমি তা পারছি না।”

অধ্যাপক এস্পির কাছে এর ব্যাখ্যা ‘খুবই সহজ’।

“আপনি ঘুমন্ত থাকার সময়ও বলে দিতে পারেন যে কয়টা বাজে,” বলেন তিনি। তিনি আরও যোগ করেন, মানুষের কাছে ঘড়ি বা স্মার্টফোন এসেছে, খুব বেশিদিন হয়নি।

তিনি বলেন, দুঃস্বপ্ন মূলত আবেগী স্বপ্ন, যাকে ঘুমন্ত অবস্থায় মানুষের অনুভূতি প্রক্রিয়াকরণের সংকেত বলা যায়।

কেউ কেউ বেশ কয়েক বছর ধরে এমন স্বপ্ন দেখতে পারেন, যার মধ্যে রয়েছে পরীক্ষার বিষয়টিও।

এস্পির মতে, এমন স্বপ্ন কখনও কখনও একই ধরনের আবেগ থেকে ‘তাড়িত হতে’ পারে, যেখানে ‘এক জায়গায় আটকে যাওয়ার’ মতো অনুভূতি কাজ করে, যদিও হঠাৎ করেও এমনটা হতে পারে।

“আমাদের মস্তিষ্ক বিভিন্ন বস্তুর শ্রেণিবিন্যাস করে থাকে।”

“যখন মানুষ অন্য কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখে পড়ে, তখন তারা সেটি নিয়ে ক্রমাগত চিন্তা করতে থাকে। ‘হ্যাঁ, আমি যখন স্কুলে ছিলাম ও পরীক্ষা দিতাম, তখন আমিও একই ধরনের অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছি।”

দুশ্চিন্তা কমিয়ে আনা

পরীক্ষা নিয়ে এ ধরনের ভীতিকর স্বপ্ন কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে করণীয় কী?

প্রথমত, আসলেই যদি কারও সামনে পরীক্ষা থাকে, সেক্ষেত্রে এস্পি’র পরামর্শ, পড়াশোনার ভালো একটি রুটিন রাখা, যেখানে ‘নিজেকে আশ্বস্ত করার জন্য’ নিয়মিত বিরতিও থাকবে। এতে করে তার একটি পরিকল্পনা থাকবে, আর তিনি সেটাকে বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করবেন।

আর মধ্যরাত পর্যন্ত জেগে পড়াশোনা নিয়ে চিন্তার বিষয়টিও এড়িয়ে যেতে হবে।

“আপনি যদি মাথায় অংকের বিভিন্ন সমীকরণ নিয়ে বিছানায় যান, তবে সেটা মধ্যরাতেও আপনার মাথায় ঘোরার ঝুঁকি থাকে,” বলেন অধ্যাপক এস্পি, যিনি স্বপ্ন ও মানসিক স্বাস্থ্যের যোগসূত্র থাকার বিষয়েও বিশেষজ্ঞ।

“নিজেকে সারিয়ে তোলার সময় দিন।”

এমনকি নিজের ব্যাপারে ‘সহানুভূতিশীল’ হওয়ার বিষয়টিও চেষ্টা করে দেখা যায়, যখন কেউ বাজে স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছেন।

“সাধারণভাবে বললে, দুশ্চিন্তা, সেটা রাতেই হোক বা দিনে, তা একই রূপে এসে থাকে। আর সে দুশ্চিন্তা হল, ‘এটা যদি না হয়!”