চিঠির পর চিঠি লিখেই চলেছেন বাবা, ১৫ বছর ঘুরিয়েও ক্ষতিপূরণ দেয়নি মৃত ছেলের অফিস

গত ১৫ বছর ধরে একের পর এক চিঠি লিখে চলেছেন উত্তর ২৪ পরগনার ইছাপুরের বাসিন্দা শৈলেন বারিক। রাষ্ট্রপতি ভবন থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর, নবান্ন থেকে বিধানসভার বিধায়কদের টেবিল—তাঁর চিঠি পৌঁছেছে সর্বত্র। কিন্তু কোনও জবাব আসেনি। তবু থেমে যাননি ৬৫ বছরের এই প্রৌঢ়। তাঁর একমাত্র লক্ষ্য, ছেলে সৌরভ বারিকের মৃত্যুর পর তার কর্মস্থল থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়। ২০১০ সালের ২৩ মার্চ, পার্ক স্ট্রিটের স্টিফেন কোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারান সৌরভ। আজ সেই ঘটনার ১৫ বছর পূর্ণ হল।

স্টিফেন কোর্টের বিধ্বংসী আগুন
২০১০ সালের ২৩ মার্চ দুপুরে স্টিফেন কোর্টে লাগা আগুনে ঝলসে, দমবন্ধ হয়ে এবং বাঁচার জন্য উঁচু থেকে লাফ দিয়ে মারা যান ৪৩ জন। এই বহুতলের আটতলায় একটি বেসরকারি সংস্থার অফিসে কাজ করতেন শৈলেন ও কবিতা বারিকের একমাত্র ছেলে সৌরভ। ২০০৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে চাকরি পেয়ে মাত্র ২২ বছর বয়সে পরিবারের আর্থিক দায়িত্ব তুলে নিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু দু’বছরও পেরোতে না পেরোতে সব শেষ হয়ে যায়।

ক্ষতিপূরণের প্রতিশ্রুতি অধরা
শৈলেন বারিক জানান, ঘটনার পর সৌরভের কর্মস্থল থেকে কয়েক বছর ধরে মৌখিকভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরে সেই বেসরকারি সংস্থা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, তারা কোনও টাকা দেবে না। শৈলেনের কথায়, “ওরা আমাদের বলেছে, ‘যা করার করে নিতে পারেন।’” এরপর থেকে সুবিচারের আশায় তিনি চিঠি লিখে চলেছেন। তবে তৎকালীন রাজ্য সরকারের কাছ থেকে কলকাতা পুলিশের মাধ্যমে ২ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ পেয়েছিলেন তাঁরা। শৈলেন বলেন, “এটুকুই আমাদের শোকের ক্ষতে মলম হয়েছে।”

অন্যদের একই অভিজ্ঞতা
স্টিফেন কোর্টে সৌরভের মতো আরও অনেকে কাজ করতেন, যাঁদের মধ্যে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছিলেন। তাঁদের পরিবারের সঙ্গেও একই ঘটনা ঘটছে। প্রথম কয়েক বছর ২৩ মার্চ স্টিফেন কোর্টের সামনে প্রতিবাদে শামিল হতেন শৈলেনের মতো স্বজনহারারা। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই প্রতিবাদও ফিকে হয়ে এসেছে। শৈলেনের ভাষায়, “প্রতিবাদের রং ধূসর হয়ে গেছে।”

নতুন স্বপ্নের শুরু
সৌরভের মৃত্যুর পর শৈলেন ও কবিতা একটি শিশুকে দত্তক নেন। তখন তার বয়স ছিল তিন বছর তিন মাস। এ বছর সে সৌরভের স্কুল থেকেই উচ্চমাধ্যমিক দিয়েছে। এই সন্তানকে নিয়ে নতুন স্বপ্ন দেখছেন তাঁরা। কিন্তু শৈলেনের প্রশ্ন, “রোজগার নেই, বয়স হয়েছে। ছেলেকে আর কীভাবে পড়াব?”

আইনি লড়াই ও প্রশ্ন
শৈলেন জানান, সৌরভের ইএসআই (কর্মচারী রাষ্ট্রীয় বীমা) ছিল। ২০১৩ সালে পেনশনের জন্য মামলা করেছিলেন তিনি, যা এখনও চলছে। তাঁর কথায়, “১৫ বছর ধরে চিঠি লিখছি। কেউ কি উত্তর দেবেন না? আমাদের মতো আরও অনেকে এই সমস্যায় ভুগছেন। আমাদের কি বিচার পাওয়ার অধিকার নেই?”

স্টিফেন কোর্ট অগ্নিকাণ্ডের দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও শৈলেন বারিকের মতো পরিবারগুলোর জন্য ন্যায়বিচার এখনও দূর অস্ত। তাঁদের চিঠি আর আবেদনের পাহাড় জমলেও, প্রতিশ্রুতির বাইরে কিছুই এগোয়নি।