৯৭.৮৫ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে FIR করে CBI, বিচারপতি ভার্মার পুরোনো ক্ষত ফের উন্মোচিত

দিল্লি হাইকোর্টের বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার সরকারি বাংলো থেকে ১৫ কোটি টাকা নগদ উদ্ধারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র শোরগোল পড়েছে। এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই আরও এক চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এসেছে। জানা গেছে, ২০১৮ সালে ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্সের ৯৭.৮৫ কোটি টাকা তছরুপের অভিযোগে সিবিআই এবং ইডি বিচারপতি যশবন্ত ভার্মার বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করেছিল। এই ঘটনা উত্তরপ্রদেশের সাম্ভাউলি চিনিকলের আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত।
অগ্নিকাণ্ডে ফাঁস টাকার পাহাড়
গত ১৪ মার্চ হোলির সময় বিচারপতি ভার্মার লুটিয়েন্স দিল্লির সরকারি বাংলোয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। আগুন নেভাতে গিয়ে দমকল কর্মীরা বাড়ির ভেতরে বিপুল পরিমাণ নগদ টাকা ছড়িয়ে থাকতে দেখেন। সূত্রের খবর, প্রায় ১৫ কোটি টাকা উদ্ধার হয়েছে। এই ঘটনার পর দিল্লি পুলিশ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও ভারতের প্রধান বিচারপতি (সিজেআই)-কে জানায়। সুপ্রিম কোর্টের কলেজিয়াম তৎক্ষণাৎ বিচারপতি ভার্মাকে তাঁর মূল আদালত এলাহাবাদ হাইকোর্টে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয় এবং একটি অভ্যন্তরীণ তদন্তের নির্দেশ দেয়।
সাম্ভাউলি চিনিকল কেলেঙ্কারি
২০১৮ সালে সাম্ভাউলি চিনিকলের বিরুদ্ধে ওরিয়েন্টাল ব্যাঙ্ক অফ কমার্স অভিযোগ করে যে, কৃষকদের জন্য ১৪৮.৫৯ কোটি টাকার ঋণ নেওয়া হলেও তার মধ্যে ৯৭.৮৫ কোটি টাকা অন্যত্র সরানো হয়। ব্যাঙ্কের দাবি, ২০১২ সালে হাপুর শাখা থেকে ৫,৭৬২ কৃষকের জন্য এই ঋণ মঞ্জুর হয়েছিল। চিনিকল কর্তৃপক্ষ এই ঋণের গ্যারান্টার ছিল। কিন্তু ঋণের টাকা কৃষকদের কাছে না পৌঁছে অন্য উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়। ২০১৫ সালে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া (আরবিআই) এটিকে ‘সন্দেহজনক প্রতারণা’ হিসেবে চিহ্নিত করে।
সিবিআই ২০১৮ সালে ১২ জনের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে, যার মধ্যে যশবন্ত ভার্মার নাম দশম অভিযুক্ত হিসেবে ছিল। তখন তিনি চিনিকলের নন-এগজিকিউটিভ ডিরেক্টর ছিলেন। এফআইআরে ব্যাঙ্ক কর্মকর্তাদের সঙ্গে চিনিকলের কর্তৃপক্ষের যোগসাজশের অভিযোগও উঠেছিল। এরপর ইডিও একটি সমান্তরাল তদন্ত শুরু করে।
তদন্তে বাধা
এলাহাবাদ হাইকোর্ট ২০২৩ সালে এই তছরুপের ঘটনায় সিবিআইকে নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেয়। আদালত উল্লেখ করে, “এই প্রতারণা বিচারব্যবস্থার বিবেককে নাড়া দিয়েছে।” কিন্তু ২০২৪ সালে সুপ্রিম কোর্ট এই নির্দেশ খারিজ করে দেয়, ফলে তদন্ত বন্ধ হয়ে যায়। সূত্রের খবর, প্রাথমিকভাবে ভার্মার নাম এফআইআরে থাকলেও পরে অজ্ঞাত কারণে তাঁর নাম প্রত্যাহার করা হয়।
রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিক্রিয়া
বাংলো থেকে টাকা উদ্ধারের ঘটনায় বিচারপতি ভার্মার সততা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কংগ্রেস নেতা জয়রাম রমেশ রাজ্যসভায় এই ঘটনা তুলে বিচারব্যবস্থায় স্বচ্ছতার দাবি জানিয়েছেন। বিজেপি নেতৃত্ব অবশ্য এটিকে বিরোধীদের ষড়যন্ত্র বলে কটাক্ষ করেছে। সিনিয়র অ্যাডভোকেট কপিল সিবাল বলেন, “বিচারব্যবস্থায় দুর্নীতি গভীর উদ্বেগের বিষয়। নিয়োগ প্রক্রিয়া আরও স্বচ্ছ হওয়া উচিত।”
কে এই যশবন্ত ভার্মা?
১৯৬৯ সালে উত্তরপ্রদেশের প্রয়াগরাজে জন্ম নেওয়া যশবন্ত ভার্মা ১৯৯২ সালে আইনজীবী হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করেন। ২০১৪ সালে তিনি এলাহাবাদ হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং ২০১৬ সালে স্থায়ী বিচারপতি হন। ২০২১ সালে তিনি দিল্লি হাইকোর্টে স্থানান্তরিত হন। তাঁর ২২ বছরের আইনি ও বিচারিক ক্যারিয়ারে এই প্রথম এমন বিতর্কে জড়ালেন তিনি।
এই ঘটনা বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তদন্তের ফলাফলের দিকে নজর রয়েছে সকলের।